২০২৬ সালের শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকি, সব মিলিয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের দামামা বাজছিল।
তবে শেষ মুহূর্তে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের সম্মিলিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আপাতত বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আরও একবার সদিচ্ছা প্রদর্শনের সুযোগ দিতে রাজি হয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৌদি আরবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য প্রকাশ করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন হামলা ঠেকাতে সৌদি আরব, কাতার এবং ওমান সম্মিলিতভাবে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসনকে যুদ্ধের পথ থেকে সরিয়ে আলোচনার টেবিলে রাখা।
সৌদি কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, ইরান যাতে তার সদিচ্ছা প্রদর্শন করার সুযোগ পায়, সে জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাজি করাতে দীর্ঘ সময় ধরে শেষ মুহূর্তের মরিয়া কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে এ তিন দেশ।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এ আলোচনা এখনো পর্দার আড়ালে অব্যাহত রয়েছে। মূলত এ তিন দেশই আশঙ্কা করছিল যে, ইরানে কোনো ধরনের মার্কিন হামলা শুরু হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা সামাল দেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর সাজা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করছিল।
পেন্টাগনের সূত্রগুলো জানিয়েছিল, ইরানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে সীমিত পরিসরে বিমান হামলার ছক কষা হয়েছিল। তবে উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ট্রাম্পের কণ্ঠে সুর বদল লক্ষ্য করা যায়।
তিনি জানান, অন্য পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের মাধ্যমে তিনি একটি বিশেষ নিশ্চয়তা পেয়েছেন। সেই নিশ্চয়তা হলো, ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের ওপর আর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে না। এ আশ্বাসের পরই ট্রাম্প সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সাময়িকভাবে সরে আসেন।
যদিও কূটনৈতিক আলোচনা সফল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, তবুও মাঠপর্যায়ে সামরিক প্রস্তুতির কোনো কমতি নেই। গত বুধবার কাতারে অবস্থিত একটি প্রধান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে জরুরি ভিত্তিতে কিছু কর্মীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সৌদি আরব ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন মিশনগুলোতে দায়িত্বরত কর্মীদের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা বা হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। পেন্টাগন কেবল সতর্কবার্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজ নেশন এবং আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং এর সঙ্গে থাকা শক্তিশালী স্ট্রাইক গ্রুপকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরিয়ে আনা হচ্ছে।
পেন্টাগন একে একটি প্রতিরক্ষামূলক মহড়া বললেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান যদি দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তবে মুহূর্তের মধ্যে হামলার প্রস্তুতি নিয়েই এ রণতরি পাঠানো হচ্ছে।
ইরান সরকার বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারিকে নাকচ করে এসেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছিল, যদি তাদের ভূখণ্ডে কোনো হামলা হয়, তবে ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোতে তারা পাল্টা ভয়াবহ আঘাত হানবে। এ পাল্টা হুমকির কারণেই সৌদি আরব ও ওমানের মতো দেশগুলো বিচলিত হয়ে পড়ে। কারণ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য সামরিক স্থাপনা রয়েছে। যুদ্ধের ফলে এ দেশগুলো সরাসরি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল।
সৌদি কর্মকর্তা স্পষ্টভাবেই বলেছেন, আমরা ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলাম যে ইরানের ওপর কোনো হামলা হলে এ অঞ্চলে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার পথ খুলে যাবে। অনিচ্ছাকৃত ও অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি এড়াতেই আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছি।
শুধু ওয়াশিংটনকে রাজি করানোই নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো তেহরানকেও একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং কঠোর বার্তা দিয়েছে।
ইরানের সরকারকে জানানো হয়েছে যে, যদি তারা মার্কিন স্থাপনায় কোনো ধরনের উস্কানিমূলক হামলা চালায়, তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের বর্তমান সম্পর্ক চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সাথে ইরানের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে কূটনৈতিক উন্নতির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।
সৌদি কর্মকর্তা আলোচনার তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে বলেন, এ অঞ্চলের বড় বিপদ সামাল দিতে আমাদের একটি নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে। বর্তমানে যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা বজায় রাখতে কাতার ও ওমান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, ইরান কি সত্যিই বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করবে? ওয়াশিংটন কতদিন এ শেষ সুযোগের জন্য অপেক্ষা করবে? ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন যখন মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পৌঁছাবে, তখন শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি যেন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের দূরদর্শী কূটনীতি আপাতত একটি বড় যুদ্ধ থামিয়ে দিলেও, স্থায়ী সমাধান এখনো বহুদূর। একদিকে মার্কিন সামরিক শক্তির মহড়া, অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট, এ দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি এখন কেবলই সুতোর ওপর ঝুলছে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন