ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো সাম্প্রতিক বিধ্বংসী হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সহযোগিতার এক অভূতপূর্ব নজির সামনে এসেছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের দীর্ঘ কয়েক মাসের সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ও নিখুঁত তথ্য আদান-প্রদানই ছিল এই ‘কৌশলগত চমকের’ মূল চাবিকাঠি। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ আর মাঠ পর্যায়ের তথ্যের সমন্বয়ে খামেনির সুরক্ষিত অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সিআইএ কয়েক মাস ধরেই আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতিদিনের অভ্যাস, চলাফেরার ধরণ এবং তার বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থা নজরে রাখছিল। বিশেষ করে গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতের সময় ইরানের আইআরজিসি (IRGC) নেতারা কীভাবে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করেন, সে বিষয়ে গভীর তথ্য পায় মার্কিন গোয়েন্দারা। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই তৈরি করা হয় খামেনির গতিবিধির একটি ডিজিটাল ম্যাপ।
শনিবার সকালে সিআইএ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য পায়—তেহরানের কেন্দ্রে একটি অতি-সুরক্ষিত কমপ্লেক্সে ইরানের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ওই বৈঠকে খামেনিসহ আইআরজিসি’র শীর্ষ কমান্ডারদের উপস্থিত থাকার কথা নিশ্চিত হয় সংস্থাটি।
প্রাথমিকভাবে ইসরায়েলের পরিকল্পনা ছিল রাতের অন্ধকারে ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো। কিন্তু শনিবার সকালে ওই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের খবর পাওয়ার সাথে সাথে যুদ্ধের পরিকল্পনা বদলে ফেলা হয়। নতুন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ নেতাদের একসাথে এক জায়গায় পাওয়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি তেল আবিব ও ওয়াশিংটন। ইসরায়েলি সময় ভোর ৬টায় যখন বিমানগুলো উড্ডয়ন করে, তখন তাদের লক্ষ্য ছিল একটিই ইরানের নেতৃত্বকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।
তেহরান সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে ছোঁড়া দীর্ঘপাল্লার ‘প্রিসিশন গাইডেড’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তেহরানের ওই বিশেষ কমপ্লেক্সে আঘাত হানে। সেখানে অবস্থিত ছিল প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, সর্বোচ্চ নেতার সচিবালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সদর দপ্তর।
ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যখন আঘাত হানে, তখন কমপ্লেক্সের একটি ভবনে জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। খামেনি ছিলেন তার ঠিক পাশের ভবনে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সূত্রের দাবি, ইরান যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও তাদের খোদ রাজধানীর কেন্দ্রে এমন অতর্কিত ও নিখুঁত হামলা হবে—তা কল্পনাও করতে পারেনি।
রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘ইরনা’ (IRNA) নিশ্চিত করেছে যে, শনিবারের হামলায় রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী শামখানি এবং মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন। এছাড়াও নিহতের তালিকায় নাম এসেছে আইআরজিসি’র অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের। যদিও গোয়েন্দা বিভাগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা শেষ মুহূর্তে সরে যেতে সক্ষম হয়েছেন, তবে ইরানের গোয়েন্দা অবকাঠামোর জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের বড় অংশই এই অভিযানে নির্মূল হয়ে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনার সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, "যুক্তরাষ্ট্র জানে খামেনি ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছেন। ‘সাম্প্রতিক এই অভিযানে সেই পুরনো গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের তথ্যগুলোকেই আরও সমৃদ্ধ করে কাজে লাগানো হয়েছে। মূলত দীর্ঘ প্রস্তুতি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা স্তরে ফাটল ধরিয়েই এই সাফল্য পেয়েছে সিআইএ ও মোসাদ।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানে এখন চরম নেতৃত্ব সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। খামেনির স্থানে কে আসবেন তা নিয়ে তেহরানের ভেতরে ও বাইরে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। তবে এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং ইরানের কয়েক দশকের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক বিশাল আঘাত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এত সুরক্ষিত একটি জায়গায় শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের খবর কীভাবে শত্রুপক্ষের কাছে পৌঁছাল, তা নিয়ে খোদ ইরানি প্রশাসনের ভেতরেই এখন সন্দেহের দানা বাঁধছে। এটি কি কেবল সিআইএ’র উন্নত প্রযুক্তির ফল, নাকি ইরানের সর্বোচ্চ স্তরে কোনো ‘ইনসাইডার’ বা বিশ্বাসঘাতক কাজ করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো অদূর ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সমীকরণ চিরতরে বদলে দিয়েছে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন