মারণাস্ত্রের অর্থনীতি

২০ হাজারি ইরানি ড্রোনে বেসামাল আমেরিকার ৪০ লাখি সুরক্ষা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ৭, ২০২৬, ১২:৪০ এএম
২০ হাজারি ইরানি ড্রোনে বেসামাল আমেরিকার ৪০ লাখি সুরক্ষা

যুদ্ধের চিরাচরিত ইতিহাসে এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেখানে উন্নত দেশগুলো কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করে স্টিলথ বা হাইপারসনিক প্রযুক্তির পেছনে ছুটছে, সেখানে ইরান খুব সাধারণ মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শাহেদ সিরিজের এই আত্মঘাতী ড্রোনগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউক্রেন পর্যন্ত এক ত্রাসের নাম।

ইরানের শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ দ্বারা তৈরি শাহেদ ১৩১ এবং ১৩৬ মডেলের ড্রোনগুলো আসলে ডেল্টা উইং আকৃতির ছোট একমুখী ক্ষেপণাস্ত্র। এতে ব্যবহার করা হয়েছে সাধারণ ফোর সিলিন্ডার পিস্টন ইঞ্জিন, যার শব্দ অনেকটা ঘাস কাটার মেশিনের মতো। 

কিন্তু এর কার্যকারিতা অত্যন্ত শক্তিশালী। এটি ৪০ থেকে ৯০ কেজি পর্যন্ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুর ওপর চক্কর কাটতে সক্ষম। রকেট বুস্টারের সাহায্যে যেকোনো ট্রাক বা জাহাজ থেকে অনায়াসেই ছোড়া এই একেকটি ড্রোনের নির্মাণ ব্যয় মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার।

ইরানের মূল রণকৌশল হলো ঝাঁকবদ্ধ হামলা। শাহেদ ড্রোনগুলো খুব ধীরগতিতে চলে এবং রাডারে এদের শনাক্ত করা বেশ কঠিন। ইরান যখন একসাথে শত শত ড্রোন ছোড়ে, তখন প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যেমন আমেরিকার প্যাট্রিয়ট বা থাড দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই ড্রোনগুলোর মূল কাজ হলো শত্রুর দামী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নষ্ট করা এবং রাডার ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা। এরপর সুযোগ বুঝে ইরান তাদের শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়ে, যা সহজেই লক্ষ্যভেদে সক্ষম হয়।

নিউইয়র্ক টাইমস ও এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো খরচের ব্যবধান। ইরানের একটি শাহেদ ড্রোন ভূপাতিত করতে যুক্তরাষ্ট্র যে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তার একেকটির দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার। 

অর্থাৎ, ইরান যদি ১০০টি ড্রোন পাঠায় যার মোট খরচ ২০ লাখ ডলার, তবে সেগুলো রুখতে যুক্তরাষ্ট্রকে খরচ করতে হবে ৪০ কোটি ডলার। এই অর্থনৈতিক অসমতা পশ্চিমা বিশ্বকে এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটে ফেলেছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই এই সমস্যার সমাধান খুঁজছে পেন্টাগন, কিন্তু সস্তা ড্রোনের বিপরীতে সস্তা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো সফলভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

ইরানের এই কৌশলী সাফল্যের পর যুক্তরাষ্ট্রও এখন তাদের নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে কেবল দামী অস্ত্র দিয়ে সস্তা ড্রোন ঠেকানো সম্ভব নয়। ফলে পেন্টাগন এখন নিজেই সস্তা ও একমুখী আত্মঘাতী ড্রোন তৈরির পথে হাঁটছে। 

মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম এই ড্রোনগুলোকে নাম দিয়েছে লুকাস, যার অর্থ স্বল্পমূল্যের চালকবিহীন যুদ্ধ ব্যবস্থা। প্রতিটি লুকাস ড্রোনের দাম প্রায় ৩৫ হাজার ডলার। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে টাস্কফোর্স স্করপিয়ন স্ট্রাইক নামে একটি বিশেষ ড্রোন স্কোয়াড্রন মোতায়েন করেছে। এটি পরিষ্কার যে ইরান যে ড্রোন কূটনীতি শুরু করেছিল, তা এখন পরাশক্তিগুলোকেও অনুকরণ করতে বাধ্য করছে।

২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে শাহেদ ড্রোনগুলো ইসরায়েলের আয়রন ডোমকে চরম পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল। যদিও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাফল্যের হার ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত বলে দাবি করা হয়, কিন্তু একটি ড্রোনও যদি সুরক্ষা প্রাচীর ভেদ করে কোনো তেল শোধনাগার বা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আঘাত হানতে পারে, তবে তার ক্ষয়ক্ষতি কয়েকশ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। বর্তমানে ইউক্রেন এই ড্রোন মোকাবিলায় বিশেষ অ্যান্টি ড্রোন স্কোয়াড তৈরি করেছে। 

ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি মধ্যপ্রাচ্যে এই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও বিনিময়ে রাশিয়ার ওপর চাপের শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। ইরানের শাহেদ ড্রোন প্রমাণ করেছে যে যুদ্ধে জয়ের জন্য সবসময় দামি অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না, বরং কৌশলী ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি অনেক সময় বিশাল সামরিক বাজেটকে অর্থহীন করে দিতে পারে। ২০ হাজার ডলারের যন্ত্র দিয়ে ৪০ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করানো ইরানের এই অর্থনৈতিক সমরনীতি আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হয়ে থাকবে।

জেএইচআর