বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য এক অস্থির সময় পার করছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের রসায়ন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইরানকে একটি বুদ্ধিদীপ্ত চুক্তি করার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আলোচনার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে পৌঁছানোর কথা নিশ্চিত করেছেন। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তেহরানকে বার্তা দিয়েছেন যে, সময় ফুরিয়ে আসছে। হেগসেথের মতে, ইরানের সামনে এখন একটি ভালো এবং বুদ্ধিদীপ্ত চুক্তি করার সুযোগ রয়েছে। তবে এই আহ্বানের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ। হেগসেথ জানিয়েছেন যে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ কেবল জোরদারই হচ্ছে না, বরং এটি এখন বৈশ্বিক রূপ নিচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের সুর প্রতিধ্বনি করে হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তি করার জন্য উদ্বিগ্ন বা তাড়াহুড়ো করছে না। বরং বল এখন ইরানের কোর্টে। অর্থাৎ, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের নীতিতে পরিবর্তন না আনে, তবে তাদের আরও কঠিন অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি পাকিস্তানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সফরের ঘোষণা দিয়েছেন। পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবেই ইরান এবং পাশ্চাত্য বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর মধ্যে একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে। আন্তর্জাতিক মহলে একটি গুঞ্জন ছড়িয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের শান্তি আলোচনা হয়তো পুনরায় শুরু হতে যাচ্ছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, পাকিস্তানের সাথে এই আলোচনা মূলত দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে। তা সত্ত্বেও বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের মতো একটি প্রতিবেশী দেশের মাধ্যমে ইরান হয়তো পরোক্ষভাবে ওয়াশিংটনের কাছে কোনো বিশেষ বার্তা পাঠাতে চাইছে।
এদিকে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান সংঘাতের উত্তাপ কমছে না। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে তিন সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করছে যে, হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননে তাদের উপস্থিতি বজায় রেখে প্রোটোকল লঙ্ঘন করছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর দাবি, ইসরায়েলি বিমান হামলা ও অনুপ্রবেশ যুদ্ধবিরতির প্রধান অন্তরায়। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল এবং লেবাননের মধ্যে কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো হিজবুল্লাহর বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার। ইসরায়েল চায় হিজবুল্লাহ যেন লিতানি নদীর ওপারে সরে যায় এবং সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করা হয়, যা হিজবুল্লাহর পক্ষে মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের নেতৃত্বকে মারাত্মকভাবে বিভক্ত বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্পের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরে ব্যাপক ফাটল দেখা দিয়েছে, যা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করছে। তবে বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান সরকার এই দাবির বিপরীতে জনগণের কাছে একটি ঐক্যের বার্তা পাঠাতে চাইছে। ইরানের সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে সরকারিভাবে একটি বার্তা পাঠানো হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে যে দৃঢ় সংহতি রয়েছে তা প্রদর্শন করা। ইরানের নেতৃবৃন্দ দেখাতে চাইছেন যে, বাইরের চাপ যতই আসুক না কেন, তারা অভ্যন্তরীণভাবে ঐক্যবদ্ধ।
ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে পিষ্ট। মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্ব সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে একটি বড় চুক্তিতে আসা ইরানের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রয়োজন। তবে ইরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে আত্মসমর্পণ করতে রাজি নয়। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য হলো ইরানকে এমন একটি চুক্তিতে বাধ্য করা যা কেবল তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিই বন্ধ করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন ও সহায়তাও বন্ধ করবে।
নৌ-অবরোধের যে কথা হেগসেথ বলেছেন, তা যদি পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হয়, তবে ইরানের তেল রপ্তানি শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তান এখানে একটি ভারসাম্যমূলক ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে। চীনও এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য ইরানের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কোনো পথ বের হয় নাকি হেগসেথের বর্ণিত নৌ-অবরোধ ইরানকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি এখন সুতোয় ঝুলছে। একদিকে মার্কিন হুংকার এবং অর্থনৈতিক অবরোধের কঠোরতা, অন্যদিকে ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতা ও অভ্যন্তরীণ সংহতি রক্ষার চেষ্টা। পাকিস্তান এবং লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই সংকট কেবল দুটি দেশের নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাথে জড়িত। ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি এবং ইরানের প্রতিরোধের অক্ষ যদি মুখোমুখি অবস্থানে অনড় থাকে, তবে শান্তি চুক্তি বা বুদ্ধিদীপ্ত চুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়তে পারে। সূত্র: বিবিসি।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন