একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধ কেবল গোলাবারুদ আর রণতরিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর পরিধি এখন ডিজিটাল জগতের অদৃশ্য 'ক্রিপ্টোকারেন্সি' থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্রের তলদেশের ইন্টারনেট কেবল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
তার ভাষ্যমতে, ওয়াশিংটনের বিশেষ অর্থনৈতিক অভিযান ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’র আওতায় ইরানের প্রায় ৫০ কোটি (৫০০ মিলিয়ন) ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টো সম্পদ বা ডিজিটাল মুদ্রা জব্দ করেছে মার্কিন প্রশাসন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার লক্ষে পরিচালিত অভিযানের সাফল্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, কয়েক ধাপে এই বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
জব্দকৃত সম্পদের পরিসংখ্যান:
সাম্প্রতিক জব্দ: প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ।
পূর্ববর্তী অভিযান: আরও ১০ কোটি ডলারের ডিজিটাল মুদ্রা।
সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের কাছাকাছি।
বেসেন্ট স্পষ্ট করে বলেন,প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে এই অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা কেবল আকাশ বা সমুদ্রপথ বন্ধ করছি না, বরং তেহরানের যে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অবরোধ এড়ানোর চেষ্টা করছিল, সেখানেও কড়া নজরদারি বসিয়েছি। ক্রিপ্টো সম্পদ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ইরানি ব্যাংক হিসাবগুলো একের পর এক ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলের একটি বড় অংশ হলো ইরানের তেল বাণিজ্যের সহযোগী রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপে রাখা। স্কট বেসেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, কোনো দেশের ব্যাংক বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি ইরানের তেলের লেনদেন বা বিপণনে সহায়তা করে, তবে তাদের ওপর 'সেকেন্ডারি স্যাংশন' বা দ্বিতীয় পর্যায়ের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। অর্থাৎ, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করলে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আর যুক্ত থাকতে পারবে না।
তবে এই চাপের বিপরীতে ইরান তার চিরাচরিত অনমনীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। তেহরান এই অভিযানকে 'উপহাস' করে জানিয়েছে, মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং নিষেধাজ্ঞার ফলে উল্টো বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়বে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মার্কিন অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে 'অসার' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
চলমান উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক ছায়াযুদ্ধ চলছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে রেখেছে, যাতে ইরান কোনো তেল রপ্তানি করতে না পারে। অন্যদিকে, ইরান দাবি করেছে যে গত ৭২ ঘণ্টায় তারা মার্কিন অবরোধ ভেঙে অন্তত ৫২টি জাহাজ সফলভাবে পরিচালনা করেছে।
হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি
মার্কিন অবরোধ: ট্রাম্পের নির্দেশে এই অবরোধ দীর্ঘায়িত করার প্রস্তুতি চলছে। ফলে তেলের দাম ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবর্তিত রুট: হরমুজ সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো এখন পানামা খালের দিকে ভিড়ছে, যার ফলে জাহাজ মালিকদের বিপুল পরিমাণ বাড়তি অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।
মাইন আতঙ্ক: ট্রাম্প নির্দেশ দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর কোনো নৌযান দেখলেই যেন গুলি করা হয়। এই জলপথ পুরোপুরি মাইনমুক্ত করতে অন্তত ৬ মাস সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্কিন চাপের মুখে ইরান ও রাশিয়ার সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে মস্কো তেহরানের পাশে থাকবে। অন্যদিকে, পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে সম্প্রতি দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার ফোনালাপ হয়েছে, যেখানে যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাশিয়া সফর শেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, পুতিনের কাছে আয়াতুল্লাহ খামেনির বিশেষ বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। রাশিয়া স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার ইরানের রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো অন্য দেশের ওপর নীতি চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থানে নেই।
যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চরম সংকটের মুখে পড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী:
চলমান সংঘাতের কারণে প্রায় ২০ লাখ ইরানি নাগরিক তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। ইরানের প্রায় ১৩০০ বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার একটি বড় অংশই মার্কিন বাংকারবিধ্বংসী বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত বলে দাবি করা হচ্ছে। ক্রিপ্টো সম্পদ জব্দ এবং তেলের বাজারে নিষেধাজ্ঞার ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান বেশ বৈচিত্র্যময়। একদিকে তিনি বলছেন যে ইরানের কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয় এবং এর জন্য তিনি সর্বোচ্চ চাপ (Maximum Pressure) বজায় রাখবেন। অন্যদিকে, তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরান চাইলে তাকে সরাসরি ফোন করে আলোচনার প্রস্তাব দিতে পারে। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যতদিন পর্যন্ত না একটি 'উপযুক্ত ও লাভজনক' চুক্তি হচ্ছে, ততদিন মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠবে না।
এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ওপেক (OPEC) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাকে ট্রাম্প 'চমৎকার' বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এর ফলে তেলের বাজারে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে এবং তেলের দাম কমবে। তবে বাস্তবতা হলো, ট্রাম্পের প্রতিটি কড়া বক্তব্যের পরই তেলের বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে।
বর্তমানে পাকিস্তান, ওমান এবং রাশিয়ার মধ্যস্থতায় একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চললেও তিনটি প্রধান বাধা এই শান্তি প্রক্রিয়াকে আটকে রেখেছে:
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরান দাবি করেছে যে আলোচনার আগে সব অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।
সার্বভৌমত্ব: হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকার করতে হবে।
পারমাণবিক অধিকার: ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি নয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শর্ত।
আগামী ১ মে'র সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ততটাই অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি যে তারা ইরানের নৌবাহিনীকে সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে ইরানের হুঁশিয়ারি, আবার আগ্রাসন হলে তারা প্রত্যাশার চেয়েও ভয়াবহ পাল্টা হামলা চালাবে। ৫০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো জব্দ কেবল এই হিমশৈলের চূড়া মাত্র; মূল লড়াইটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হওয়ার লড়াই।
এই ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলায় শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবে, তা নির্ভর করছে ট্রাম্পের ‘আর্ট অফ দ্য ডিল’ এবং তেহরানের 'প্রতিরোধের কৌশলের' ওপর। তবে এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষ।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন