অস্ট্রেলিয়ার নর্দার্ন টেরিটরির অ্যালিস স্প্রিংস শহরে এক চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত শনিবার নিখোঁজ হওয়া পাঁচ বছর বয়সী এক আদিবাসী কন্যা শিশুর মরদেহ উদ্ধারের পর প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় হাসপাতাল চত্বর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
পুলিশের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ঘটনাটি অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী আইন বা পে-ব্যাক এবং রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থার মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও গভীর শোকের প্রতিফলন হিসেবে সামনে এসেছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত শনিবার রাতে অ্যালিস স্প্রিংসের কাছে একটি আদিবাসী টাউন ক্যাম্পে পাঁচ বছর বয়সী শিশুটি, যাকে সাংস্কৃতিক কারণে বর্তমানে কুমানজায়ী লিটল বেবি হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে, তাকে শোবার ঘরে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল। মধ্যরাতের ঠিক আগে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে পুলিশ এবং স্থানীয় কয়েকশ স্বেচ্ছাসেবী সংলগ্ন বুশল্যান্ড এবং মরুভূমি এলাকায় চিরুনি অভিযান চালায়। বৃহস্পতিবার দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিশুটির নিথর দেহ খুঁজে পাওয়া যায়।
পুলিশ জানায়, শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার সময়কালেই জেল থেকে মাত্র ছয় দিন আগে মুক্তি পাওয়া জেফারসন লুইস নামের এক ব্যক্তিও এলাকা থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই লুইসের ওপর সন্দেহ ঘনীভূত হয় এবং পুলিশ তাকে ধরতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে।
গ্রেপ্তারের নাটকীয়তা ও সহিংস সংঘর্ষের বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্যরা অভিযুক্ত জেফারসন লুইসকে দেখতে পান। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই লুইস স্থানীয়দের মাধ্যমে একটি ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হন। নর্দার্ন টেরিটরি পুলিশ কমিশনার মার্টিন ডোল উল্লেখ করেন, পুলিশ যখন লুইসকে খুঁজে পায়, তখন তিনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন।
লুইসকে চিকিৎসার জন্য অ্যালিস স্প্রিংস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে উত্তেজনার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। প্রায় ২০০ জন মানুষের একটি বিশাল জনতা হাসপাতালের বাইরে জড়ো হয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুঁড়ছে এবং অন্তত একটি পুলিশ গাড়িতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।
পুলিশ কমিশনার ডোল এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, হাসপাতালের বাইরের এই দৃশ্যগুলো কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা, ক্ষমা করা বা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও জানান, লুইসের আঘাত মারাত্মক না হওয়ায় তাকে বিমানে করে ডারউইনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে তিনি পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। এই সহিংসতার মূলে ছিল আদিবাসী প্রথাগত বিচার ব্যবস্থার একটি ধারণা যা পে-ব্যাক নামে পরিচিত।
হাসপাতালের বাইরে জড়ো হওয়া জনতা চিৎকার করে লুইসকে তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছিল এবং তাকে পে-ব্যাক এর মুখোমুখি করার হুমকি দিচ্ছিল। এটি সেন্ট্রাল অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী প্রথাগত আইনের অধীনে একটি শারীরিক বা প্রতীকী শাস্তি যা সাধারণত প্রবীণদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় এবং এর উদ্দেশ্য হলো বিরোধপূর্ণ পরিবার বা গোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা।
এই বিষয়ে স্থানীয় আলিয়াওয়ারে আদিবাসী ব্যক্তি মাইকেল লিডল বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পে-ব্যাক শব্দের ব্যবহার কেবল সহিংসতাকেই উস্কে দিচ্ছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্রথাগত পে-ব্যাক অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং পরিকল্পিতভাবে করা হয়, এটি তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ নেওয়ার বিষয় নয়। তিনি সবাইকে রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান। এই চরম অস্থিরতার মধ্যেও নিহত শিশুর পরিবার এবং স্থানীয় আদিবাসী প্রবীণরা শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন।
কুমানজায়ী লিটল বেবির দাদা এবং সিনিয়র ওয়ালপিরি নেতা রবিন গ্রানাইটস এক বিবৃতিতে বলেন, এই সপ্তাহে যা ঘটেছে তা আমাদের সংস্কৃতি নয়। আমাদের সন্তানরা অমূল্য এবং আমরা স্বাভাবিকভাবেই রাগান্বিত ও ব্যথিত, কিন্তু এই লোকটি ধরা পড়েছে এবং এখন আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে তার কাজ করতে দিতে হবে। আমাদের এখন সময় প্রয়োজন কুমানজায়ীর জন্য শোক পালন করার এবং তার পরিবারকে আগলে রাখার।
নিহত শিশুটির মা তার এক আবেগঘন বার্তায় জানান, তার মেয়ে ছিল অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল এবং তাকে ছাড়া জীবন কাটানো হবে চরম কষ্টের। তিনি সেই সমস্ত পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন যারা দিনরাত এক করে তার মেয়েকে খুঁজেছেন। বর্তমানে অভিযুক্ত জেফারসন লুইস পুলিশি হেফাজতে ডারউইনে চিকিৎসাধীন। পুলিশ কমিশনার মার্টিন ডোল নিশ্চিত করেছেন যে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে লুইসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হবে।
পুলিশ নিশ্চিত যে পলাতক অবস্থায় কেউ না কেউ লুইসকে সাহায্য করেছে এবং যারা তাকে সাহায্য করেছেন তাদের কাছেও পুলিশ পৌঁছে যাবে বলে কমিশনার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ময়নাতদন্ত এবং ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুটির মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ও টরেস স্ট্রেট আইল্যান্ডার সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে পরিবারের অনুমতি ব্যতীত মৃত ব্যক্তির নাম বা ছবি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এই প্রতিবেদনে শিশুটিকে কুমানজায়ী লিটল বেবি নামে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তার ছবি পরিবারের অনুমতিক্রমেই প্রকাশ করা হয়েছে। অ্যালিস স্প্রিংসের এই ঘটনাটি পুরো অস্ট্রেলিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
একদিকে যেমন একটি নিস্পাপ শিশুর করুণ মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, অন্যদিকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সমাজ ও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন এখন শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি এই জঘন্য অপরাধের দ্রুত ও কঠোর বিচারের আশ্বাস দিচ্ছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন