মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল মোড় নিয়েছে। একদিকে ইরানের পক্ষ থেকে শান্তি প্রস্তাবের পাল্টা ১৪ দফা প্রস্তাব উত্থাপন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর জন্য ৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অস্ত্র সহায়তা প্যাকেজ দ্রুত অনুমোদনের ঘটনা পুরো অঞ্চলের ভারসাম্যকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
রোববার ভোরে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই নতুন প্রস্তাবটি পর্যালোচনার ঘোষণা দিলেও এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শুরুতেই গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ে পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যে ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাবের জবাবে নিজেদের ১৪ দফা সম্বলিত একটি রূপরেখা পেশ করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই ১৪ দফা প্রস্তাবে তেহরানের নিরাপত্তা স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
তবে ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, "আমরা ইরানের কাছ থেকে একটি প্রস্তাব পেয়েছি এবং আমি সেটি ব্যক্তিগতভাবে পর্যালোচনা করব। তবে আমি কল্পনাও করতে পারছি না যে এটি আমাদের জন্য গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধান হতে যাচ্ছে।" ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে আস্থার সংকট কতটা প্রকট। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সম্ভবত এমন কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে যা ট্রাম্প প্রশাসনের 'সর্বোচ্চ চাপ' নীতির পরিপন্থী।
একদিকে যখন আলোচনার টেবিল গরম, অন্যদিকে রণক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ওয়াশিংটন কোনো কার্পণ্য করছে না। পেন্টাগন জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর জন্য ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়াটি 'ফাস্ট-ট্র্যাক' বা দ্রুততর করা হয়েছে। এই অস্ত্র বিক্রির তালিকায় অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষ করে ইসরায়েল ইতিমধ্যেই কয়েক বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল চুক্তি অনুমোদন করেছে, যার আওতায় তারা নতুন ফাইটার স্কোয়াড্রন (যুদ্ধবিমান) সংগ্রহ করবে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের সাথে সাম্প্রতিক ছায়াযুদ্ধ এবং সরাসরি সংঘাত থেকে পাওয়া 'অপারেশনাল লেসন' বা কৌশলগত শিক্ষাগুলো কাজে লাগাতেই এই নতুন বিমান বহর যুক্ত করা হচ্ছে। এই সামরিক প্রস্তুতি ইঙ্গিত দেয় যে, কূটনীতি ব্যর্থ হলে অঞ্চলটি একটি ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে।
বিশ্বের খনিজ তেলের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট 'হরমুজ প্রণালী' নিয়ে ইরান এক চরম কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে। ইরানের পার্লামেন্ট একটি নতুন আইন পাস করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার ফলে এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হবে।
কোনো ইসরায়েলি জাহাজ কখনোই এই জলপথ ব্যবহার করতে পারবে না। যেসব দেশকে ইরান 'শত্রু' হিসেবে গণ্য করে, তাদের জাহাজ চলাচলের জন্য বিশেষ পারমিট বা অনুমতি নিতে হবে। এই অনুমতি পেতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে নির্দিষ্ট পরিমাণ 'ক্ষতিপূরণ' বা জরিমানা প্রদান করতে হবে।
যদি এই আইন কার্যকর হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা ইতিমধ্যেই একে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপে তাদের সামরিক উপস্থিতির বিষয়ে একটি বড় ঘোষণা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের যে পরিকল্পনা আগে করা হয়েছিল, প্রকৃত সংখ্যাটি তার চেয়েও অনেক বেশি হবে।
পেন্টাগন আগে জানিয়েছিল যে, আগামী এক বছরে জার্মানি থেকে ৫,০০০ সেনা সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে, এই সংখ্যাটি আরও অনেক বড় হবে। ট্রাম্পের মতে, মিত্র দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি খরচ করতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। তার এই 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে যখন ইউক্রেন ও রাশিয়ার পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল।
বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওয়াশিংটন দ্বি-মুখী কৌশল গ্রহণ করেছে। একদিকে তারা আলোচনার পথ খোলা রাখার নাটকীয়তা বজায় রাখছে, অন্যদিকে মিত্রদের হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র তুলে দিয়ে ইরানকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছে।
ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাব যদি ট্রাম্পের ভাষায় 'অগ্রহণযোগ্য' হয়, তবে কূটনীতির পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কড়াকড়ি এবং ইসরায়েলের নতুন সামরিক শক্তি প্রদর্শন মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রক্সি যুদ্ধ অথবা সরাসরি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অস্ত্র বিক্রির এই বিশাল প্যাকেজটি মূলত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই অস্ত্র সহায়তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, অঞ্চলে অস্ত্রের আধিক্য উত্তেজনা কমানোর বদলে সংঘাতের বারুদ আরও বাড়িয়ে দেয়।
২০২৬ সালের মে মাসের এই উত্তাল সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্ব তাকিয়ে আছে হোয়াইট হাউসের দিকে। ইরানের প্রস্তাবটি ট্রাম্প নাকচ করে দিলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি কি ইরান সত্যিই বাস্তবায়ন করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেবে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতি এবং বিশ্ব রাজনীতি কতটা নিরাপদ থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্য যেন এক বারুদের স্তূপ, যেখানে সামান্য একটি ভুল সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের জন্ম দিতে পারে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন