ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধার জেলার ঐতিহাসিক ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদের স্থানটিকে ‘সরস্বতী মন্দির’ বলে রায় দিয়েছেন মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট।
শুক্রবার হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চের বিচারপতি বিজয়কুমার শুক্ল ও বিচারপতি অলোক অবস্থির ডিভিশন বেঞ্চ এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে আদালত বলেন, এই আদেশের ফলে মুসলিম সম্প্রদায় মসজিদ নির্মাণের জন্য বিকল্প জমির দাবিতে রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানাতে পারবে এবং সরকারের উচিত গুরুত্বের সাথে সেই আবেদন বিবেচনা করা।
হাইকোর্টের রায়ে ভোজশালার সংরক্ষিত চরিত্রটি বজায় রাখা হয়েছে। আদালত জানান, ১৯৫৮ সালের আইন অনুযায়ী এই স্থাপত্যটি সংরক্ষিত থাকবে এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ভারতের পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ বিভাগ বা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) হাতেই থাকবে। তবে সেখানে উপাসনা বা পূজার্চনার অধিকার থাকবে শুধুই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের। এই রায়ের ফলে ভোজশালায় মুসলিমদের নামাজ পড়ার আর কোনো অধিকার থাকছে না, যা ২০০৩ সালে এএসআইয়ের এক আদেশে তাদের দেওয়া হয়েছিল।
উত্তর প্রদেশের অযোধ্যার বাবরি মসজিদের মতো এই ভোজশালা কমপ্লেক্স নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।
হিন্দুদের দাবি: মধ্যপ্রদেশের মালব্য অঞ্চলের পারমার রাজবংশের রাজা ভোজের (১০১০–১০৫৫) আমলে এখানে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর মন্দির স্থাপিত হয়েছিল, যা একটি বিখ্যাত সংস্কৃত শিক্ষালয়ও ছিল।
মুসলিমদের দাবি: এই স্থানটি মূলত ‘কামাল মাওলা দরগাহ ও মসজিদ’। আলাউদ্দিন খিলজির আমলে ভোজশালা ধ্বংস হওয়ার পর দিলওয়ার খান ঘোরির সময়ে এর একাংশে মসজিদ নির্মিত হয়। এএসআইয়ের তথ্যমতে, চতুর্দশ শতকে সুফি সাধক কামালউদ্দিনের মৃত্যুর পর এই প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় এবং পরবর্তীতে সেখানে ‘কামাল মাওলা মসজিদ’ গড়ে ওঠে।
আদালত এই রায়টি দিয়েছেন মূলত এএসআইয়ের সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে। ডিভিশন বেঞ্চ উল্লেখ করেন, ঐতিহাসিক বিভিন্ন সাহিত্য ও প্রমাণ নির্দেশ করে যে বিতর্কিত স্থানটি মূলত সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র এবং নিশ্চিতভাবেই এটি সরস্বতীর মন্দির ছিল। এছাড়া এখানে হিন্দুরা দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক উপাসনা করে আসছে।
অযোধ্যা আন্দোলনের সময় থেকে এই বিতর্ক তীব্র হলে স্থানীয় প্রশাসন একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা চালু করেছিল। সেই নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি মঙ্গলবার হিন্দুরা সেখানে পূজা এবং প্রতি শুক্রবার মুসলিমরা জুমার নামাজ আদায় করতে পারতেন। এছাড়া প্রতি বছর বসন্ত পঞ্চমীর দিন হিন্দুরা সেখানে সরস্বতী পূজার বিশেষ অনুমতি পেতেন।
নতুন রায়ের পাশাপাশি হাইকোর্ট মধ্যপ্রদেশ সরকারকে ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে, মামলাকারীদের দাবি অনুযায়ী ভোজশালার মূল সরস্বতী মূর্তিটি লন্ডনের জাদুঘরে রয়েছে কি না এবং তা ফিরিয়ে এনে পুনরায় স্থাপন করা কতটা যৌক্তিক, তা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের এই রায়ের পর মুসলিম পক্ষ সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন