যারা বিভিন্ন সময়ে অবৈধ উপায়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন, তারা যদি এখন ‘স্বেচ্ছায়’ নিজের দেশে ফিরে যেতে চান তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ বা মামলা নেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তবে এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন সাতক্ষীরা ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে ভিড় করছেন শত শত মানুষ।
তাদেরই একজন বাচ্চু মুন্সি। তিনি বলেন, যখন আমার বয়স মাত্র বছর দশেক, তখন বাবা-মায়ের হাত ধরে ভারতে চলে আসি। প্রায় ৩৮ বছর হয়ে গেল এখানেই আছি। এখানেই বিয়ে করেছি, ছেলেমেয়ে হয়েছে এবং তাদের বিয়েও দিয়েছি।

কলকাতার দমদম বিমানবন্দর লাগোয়া এলাকায় সপরিবারে থাকতেন বাচ্চু। তিনি খুলনা জেলার আদি বাসিন্দা হলেও এখন সপরিবারে হাজির হয়েছেন বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা লাগোয়া উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে।
বাচ্চুর মতো প্রতিদিন বহু নারী, পুরুষ ও শিশু হাকিমপুর সীমান্তে জড়ো হচ্ছেন। তাদের দাবি, তারা কেউ যশোর, কেউ খুলনা, আবার কেউ সাতক্ষীরা থেকে বিভিন্ন সময়ে ভারতে গিয়েছিলেন। কেউ গেছেন বছর দুয়েক আগে, আবার কেউ পাঁচ-ছয় বছর আগে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি জয়ী হয়ে নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দেন, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’দের আর ভারতে থাকতে দেওয়া হবে না, তাদের দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে। এই ঘোষণার পর গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিনই সাত সকালে সীমান্তে ভিড় জমাচ্ছেন স্বদেশে ফিরতে চাওয়া এসব মানুষ।
হাকিমপুরের স্থানীয় বাসিন্দা হাসানুর গাজি জানান, শুরুর দিকে দৈনিক ১০-১২ জন করে আসছিলেন। এরপর প্রতিদিনই এই সংখ্যা বাড়ছে। দিন তিনেক আগে থেকে এই সংখ্যা কয়েকশোতে গিয়ে ঠেকেছে। সীমান্তে জড়ো হওয়া অনেকেই স্বীকার করেছেন, তারা ‘চোরাই পথে’ ভারতে গিয়েছিলেন এবং পশ্চিমবঙ্গে ‘অবৈধভাবেই’ বসবাস ও কাজকর্ম করছিলেন।
সীমান্ত চৌকিতে একদিন
কিমপুর এলাকাটি উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর থানার অধীনস্থ। বিএসএফের চেকপোস্ট পেরিয়ে কিছুটা গেলেই তারালি গ্রাম, আর তারপরই সোনাই নদী। নদীর ওপারেই বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা।
সীমান্ত চৌকিতে সরেজমিনে দেখা যায়, বাংলাদেশে চলে যাওয়ার জন্য সীমান্তে জড়ো হওয়া মানুষদের প্রথমে একটি পরিত্যক্ত ঘরে অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে। সেখান থেকে পুলিশ কর্মীরা একেকটি পরিবারকে ডেকে এনে যাবতীয় নথিপত্র যাচাই করছেন। বাংলাদেশের নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র দেখার পাশাপাশি লিখে নেওয়া হচ্ছে নাম ও স্থায়ী ঠিকানা। এরপর নেওয়া হচ্ছে ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য।
সীমান্তে আসা ব্যক্তিদের কীভাবে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, সে ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন বা বিএসএফ আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে কথা বলেনি। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী হাসানুর গাজি জানান, চেকপোস্টে নথি যাচাই ও বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হওয়ার পর তাদের সীমান্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বিএসএফ। এখান থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে ‘আমোদিয়া’ নামের একটি হাঁটা সীমান্ত (ওয়াকিং বর্ডার) আছে, সেখান দিয়েই পার করে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি দিনের বেলাতেও হচ্ছে, আবার অনেক সময়ে রাত পর্যন্ত গড়াচ্ছে। যাদের প্রক্রিয়া শেষ হতে দেরি হচ্ছে, তাদের বাসে করে স্বরূপনগর থানা এলাকায় গড়ে তোলা ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটক শিবিরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
‘ভারতের ভোটার কার্ডও করিয়েছিলাম’
স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা শাওজি জানান, সীমান্ত পেরিয়ে যারা বাংলাদেশে চলে যাওয়ার জন্য জড়ো হয়েছেন, তাদের অনেকের কাছেই আধার কার্ড, প্যান কার্ডসহ ভারতের নানাবিধ পরিচয়পত্র আছে। এমনকি কারো কারো কাছে সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রও রয়েছে।
ভারতের ভোটার কার্ড থাকার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন সীমান্তে অপেক্ষায় থাকা বাচ্চু মুন্সিও। তিনি বলেন, অনেক চেষ্টা করে ভোটার কার্ড করিয়েছিলাম। আধার কার্ড, প্যান কার্ডও ছিল। প্রথমবার আমি এখানে ভোট দিয়েছিলাম ২০২৪ সালে।
তবে বিপত্তি বেঁধেছে ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে। এই সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বাচ্চুর পুরো পরিবারের নাম।
নাজমা নামের এক নারী বলেন, “বিজেপি এখানে সরকারে আসার পর থেকেই তো বলে দিয়েছে আমাদের আর থাকতে দেবে না। তাই বাধ্য হয়ে নিজের দেশে চলে যাচ্ছি। বাংলাদেশের লোক ধরলেই পুলিশ জেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এখন সুযোগ দিয়েছে ফেরত চলে যাওয়ার, তাই চলে যাচ্ছি।” নাজমার দাবি, তিনি যশোরের বাসিন্দা।
‘ভারতে আর ফিরব না’
নিজেকে সাতক্ষীরার বাসিন্দা বলে দাবি করা রাইসা পারভিন বলেন, বিজেপি যখন থেকে জিতেছে, তারপর থেকেই বলছে বাংলাদেশিদের আর থাকতে দেবে না। তাই আমি, আমার স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে চলে যেতে চাই। এসআইআরের সময়ে যখন অনেকে বাংলাদেশে চলে গেছে, সেই সময়েই আমার বাবা-মা ফিরে গেছেন।
শেখ মাসুদ রানা নামে আরেকজন বলেন, সরকারি ঘোষণা তো আছেই, একই সঙ্গে আমরা যে অঞ্চলে থাকতাম, সেখানকার পুলিশ খুব কড়াকড়ি করছে। বাড়িওয়ালারাও আমাদের আর ভাড়া দিয়ে রাখতে চাইছে না।
সীমান্তে জড়ো হওয়া আখতারুল মোড়ল বলেন, পুলিশ এসে ঝামেলা করছে, বলছে বাংলাদেশিরা ভাগো। আগেরবার যখন এসআইআর হলো, সেই সময়ে চলে গেলেই ভালো হতো।
অন্যদিকে শাহিন আলম মোল্লা নামে আরেকজন স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তিনি আর কখনো ‘অবৈধ পথে’ ভারতে ফিরবেন না। যদি কোনোদিন যানও, তবে বৈধভাবে পাসপোর্ট-ভিসা নিয়েই বেড়াতে যাবেন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন