দিল্লির হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, বিদেশি নাগরিকসহ নিহত অন্তত ২১

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ৩, ২০২৬, ০২:০১ পিএম
দিল্লির হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, বিদেশি নাগরিকসহ নিহত অন্তত ২১

রাজধানী দিল্লির মালবীয় নগরের হোর্ড রানি এলাকার একটি বহুতল হোটেলে আজ সকালে এক ভয়াবহ ও বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত অন্তত ২১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে একটি বড় অংশই বিদেশি নাগরিক। 

আগুনে পুড়ে এবং ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এছাড়া বহুতল ভবনের ভেতর থেকে অলৌকিকভাবে ও দমকলের তৎপরতায় ৪০ জনেরও বেশি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আহতদের নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আজ সকাল প্রায় ৮টা ৫০ মিনিট নাগাদ দক্ষিণ দিল্লির মালবীয় নগরের হৌজ রানির একটি পাঁচতলা ভবনের বেসমেন্টে অবস্থিত 'ফ্লুরিশ স্টে'  হোটেলের রেস্তোরাঁ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো বেসমেন্টে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে গলগল করে কালো ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান শিখা ওপরের তলাগুলোর দিকে উঠতে থাকে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, আগুন এতটাই দ্রুত ছড়ায় যে পাশের 'মিকাসা ইন'  নামক আরেকটি হোটেলেও তা গ্রাস করে নেয়। সংকীর্ণ গলির মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় পুরো ভবনটি দ্রুত বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। সেই সময় হোটেলের ২৫টি ঘরে থাকা প্রায় ৪০ জন অতিথি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। হঠাৎ চারদিক ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যাওয়া এবং মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচিতে হোটেলের ভেতর চরম আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ি তৈরি হয়। প্রাণ বাঁচাতে অনেককে পাঁচতলার জানালা দিয়ে নিচে লাফিয়ে পড়তেও দেখা যায়, যার বেশ কিছু শিউরে ওঠার মতো ভিডিও ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দিল্লি ফায়ার সার্ভিস (ডিএফএস), দিল্লি পুলিশ, দিল্লি বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (ডিডিএমএ) এবং ক্যাটস  অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা। তবে দুর্ঘটনাস্থলটি হৌজ রানির অত্যন্ত সংকীর্ণ গলির ভেতরে হওয়ায় প্রথম দিকে দমকলের বড় গাড়িগুলো সেখানে প্রবেশ করতে বেশ বেগ পেতে হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে দ্রুততার সাথে মোতায়েন করা হয় ২টি ওয়াটার ইঞ্জিন, ২টি ওয়াটার বাউজার, ১টি কুইক রেসপন্স ভেহিকল (QRV) ও অন্যান্য জরুরি অগ্নিনির্বাপক ইউনিট। 

দমকল কর্মীরা মই এবং বিশেষ সরঞ্জামের সাহায্যে হোটেলের জানালা ও বারান্দা থেকে একের পর এক আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে শুরু করেন। ধোঁয়ায় অচেতন হয়ে পড়া বহু অতিথিকে কাঁধে করে বের করে আনেন উদ্ধারকারীরা। দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হোটেলের ভেতর থেকে প্রায় ৪০ জনকে সুরক্ষিতভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

দিল্লি পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য। পাঁচতলা বিশিষ্ট এই হোটেল ভবনটিতে যাতায়াতের জন্য মাত্র একটিই প্রবেশ ও (বাহির) পথ ছিল। কোনো জরুরি আপৎকালীন বহির্গমন পথ বা 'ইমার্জেন্সি এক্সিট' ছিল না।

হোটেলের প্রবেশপথের কাছেই বেসমেন্ট থেকে আগুন ও ধোঁয়া ওঠায় ভেতরের অতিথিদের নিচে নেমে আসার সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। ধোঁয়া বেরোনোর পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন না থাকায় পুরো ভবনটি একটি গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়। ফলে সিংহভাগ মানুষের মৃত্যু হয়েছে মূলত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে।

দিল্লি পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, হোটেলের স্থাপত্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে মারাত্মক গলদ ছিল। এত বড় একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে মাত্র একটি সাধারণ প্রবেশপথ থাকা এবং কোনো বিকল্প এক্সিট না থাকা আইনত অপরাধ। এই কারণেই নিহতের সংখ্যা এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গেছে, নিহত ২১ জনের মধ্যে অধিকাংশই বিদেশি নাগরিক। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই হোটেলটি চিকিৎসার জন্য ভারতে আসা বিদেশিদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। দক্ষিণ দিল্লির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় হাসপাতাল 'ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, সাকেত'-এর ঠিক কাছাকাছি হওয়ায় ইরাক, আফগানিস্তান এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বহু রোগী ও তাদের আত্মীয়রা এই 'ফ্লুরিশ স্টে' ও 'মিকাসা ইন' হোটেলে আবাসন নিয়েছিলেন।

যারা চিকিৎসার জন্য এসে এখানে অবস্থান করছিলেন, তাদের এই মর্মান্তিক পরিণতিতে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত ও আহতদের পরিচয় জানার এবং সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসগুলোর সাথে যোগাযোগ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে দিল্লি পুলিশ।

হোটেলের রেস্তোরাঁয় কর্মরত প্রধান বাবুর্চি কেসর সিং এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মুহূর্তের প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি জানান, সকাল ৮টা নাগাদ তিনি যখন রান্নাঘরে কাজ শুরু করার জন্য একটি বৈদ্যুতিক চুলা  চালু করার চেষ্টা করেন, তখনই হঠাৎ করে বিকট শব্দে আগুন জ্বলে ওঠে।

নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কেসর সিং বলেন, আমি সকাল আটটা নাগাদ ইলেকট্রিক স্টোভটি অন করতেই আচমকা চারদিকে আগুনের শিখা দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। আমি সাথে সাথে আমার সহকারীকে সতর্ক করি যে হোটেলে আগুন লেগে গেছে। কিন্তু আমি যখন রান্নাঘর থেকে বাইরে পা রাখলাম, তখন দেখলাম পুরো হোটেলটি ততক্ষণে আগুনের গ্রাসে চলে গেছে। চারিদিকে শুধু কালো ধোঁয়া আর চিৎকার। আমি কোনোমতে সেখান থেকে প্রাণ হাতে নিয়ে বাইরে পালিয়ে আসতে সক্ষম হই।

তার এই বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট অথবা গ্যাস বা চুলার লাইনে কোনো লিকেজের কারণেই এই মারাত্মক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল।

এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়  থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (টুইটার) একটি পোস্টের মাধ্যমে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদী নিহতদের পরিবারের জন্য ২ লক্ষ টাকা, এবং আহতদের জন্য ৫০,০০০ টাকা, আর্থিক সহায়তার  ঘোষণা করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পোস্টে বলা হয়, দিল্লির মালবীয় নগরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণহানির খবর অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যারা তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন তাদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। ক্ষতিগ্রস্তদের সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে প্রশাসন।

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাও এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং উদ্ধারকাজের তদারকি করছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, মালবীয় নগরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা। আমি আহতদের দ্রুত সুস্থতা এবং এই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত সকলের শক্তি ও সাহসের জন্য প্রার্থনা করছি।

তিনি আরও জানান যে, দিল্লি সরকারের সমস্ত জরুরি সংস্থা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে উদ্ধারকাজ চালিয়েছে, যার ফলে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। দিল্লি সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সমস্ত ধরনের চিকিৎসা ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

দিল্লির এই ঘটনা আবারও রাজধানীর বাণিজ্যিক ভবনগুলোর অগ্নিনির্বাপণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা  নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল। একটি ঘিঞ্জি আবাসিক এলাকায় কীভাবে নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে বেসমেন্টে রেস্তোরাঁ ও পাঁচতলা হোটেল চালানো হচ্ছিল, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।

দিল্লি পুলিশ ইতিমধ্যেই হোটেলের মালিক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যু এবং সুরক্ষাবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। ফায়ার লাইসেন্স ও বিল্ডিং প্ল্যানের সঠিক অনুমতি ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রাজধানীর বুকে এই ধরনের 'মৃত্যুকূপ' তৈরি হওয়া রুখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এএন