মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় দেখা যাচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত পরোক্ষ কারিগরি আলোচনা 'ইতিবাচক অগ্রগতি'র মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। কাতার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (MoU) বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে উভয় পক্ষ ফলপ্রসূ আলোচনা করেছে।
অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সাথে এই চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সরাসরি আলোচনা এবং রিপোর্ট করার জন্য একটি বিশেষ ‘যোগাযোগ চ্যানেল’ বা ‘কমিউনিকেশন চ্যানেল’ স্থাপন করা হবে।
একই সাথে মার্কিন রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন যে, ইরানের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ বা 'ডিনিউক্লিয়ারাইজেশন' প্রক্রিয়া বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে চলছে।
তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ার সমান্তরালে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে, বিশেষ করে ইরাক এবং ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে চরম উত্তেজনা এবং সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ইরাকে মার্কিন ডলার সরবরাহ শুরু
নিউইয়র্ক টাইমসের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘ কয়েক মাস স্থগিত রাখার পর যুক্তরাষ্ট্র অবশেষে ইরাকে বিমানযোগে মার্কিন ডলারের চালান পাঠানো পুনরায় শুরু করেছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির দুই জন ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার বরাত দিয়ে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
এর আগে, ইরাক সরকারকে ইরানের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ওয়াশিংটন এই ডলার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে আল জাজিরা স্বাধীনভাবে এই রিপোর্টের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি।
উল্লেখ্য, ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইরাকে সক্রিয় ইরান-পন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বারবার উপসাগরীয় দেশগুলো এবং জর্ডানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। শুধু তাই নয়, বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসসহ ইরাকের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনা ও স্বার্থকে লক্ষ্য করেও একের পর এক হামলা চালানো হয়েছিল, যা ওই অঞ্চলে ওয়াশিংটনকে চরম বেকায়দায় ফেলে দেয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরাকের অর্থনীতি সচল রাখতে এবং বাগদাদের ওপর প্রভাব ধরে রাখতেই যুক্তরাষ্ট্র এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাড়িঘর ভাঙচুর ও গ্রেপ্তার
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যখন কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বরফ গলার আভাস মিলছে, ঠিক তখনই অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। গতকাল রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক অভিযান, ভাঙচুর ও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনি গণমাধ্যমগুলো বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ দিয়েছে।
নাবলুসে মধ্যরাতের অভিযান: ভোররাতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নাবলুস শহরে আকস্মিক প্রবেশ করে। তারা বেশ কয়েকটি ফিলিস্তিনি বাড়িঘরে জোরপূর্বক তল্লাশি চালায় এবং সাধারণ বাসিন্দাদের দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এতে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ডুমা গ্রামে কৃষি ভবন ধ্বংস: নাবলুসের দক্ষিণে অবস্থিত ডুমা গ্রামে অভিযান চালিয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ফিলিস্তিনিদের মালিকানাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ভবন বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
সালফিতে দুই ভবন ধ্বংস ও আটক: সালফিতের কাফর আদ-দিক শহরের পশ্চিমে অবস্থিত খাল্লাত আল-হারামিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী দুটি ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এই অভিযানের সময় অন্তত পাঁচজন ফিলিস্তিনি নাগরিককে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আটক রেখে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
রামাল্লায় ফিলিস্তিনি বাড়ি দখল: রামাল্লার উত্তরে আতারা শহরে ইসরায়েলি সেটলার বা অবৈধ অভিবাসীদের একটি বড় দল এক ফিলিস্তিনির বাড়ি জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ইসরায়েলি সেনাদের মদদেই এই দখলদারিত্বের ঘটনা ঘটেছে।
বেথলেহেমে সামরিক তৎপরতা: বেথলেহেমের দক্ষিণে অবস্থিত আল-খাদের শহরেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রবেশ করেছে এবং সেখানে সামরিক টহল জোরদার করা হয়েছে।
এছাড়াও, গত এপ্রিল মাসে নাবলুসের আল-লুব্বান আশার্কিয়া গ্রামের উপকণ্ঠে ইসরায়েলি সেটলারদের হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি যানের ছবি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিয়মতান্ত্রিক সহিংসতারই বহিঃপ্রকাশ।
উত্তর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন
পশ্চিম তীরের আরেকটি সংবেদনশীল ঘটনায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, উত্তর পশ্চিম তীরের 'মুখমাস' নামক একটি গ্রামে বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি নাগরিক প্রবেশ করার পর থেকে তাদের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
এই ঘটনার পর ইসরায়েলি কমান্ডো এবং নিরাপত্তা বাহিনী মুখমাস গ্রামে অত্যন্ত আগ্রাসী অভিযান শুরু করেছে। সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, কোনো ধরনের নিরাপত্তা হুমকি বা অপহরণের আশঙ্কা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে পুরো এলাকায় 'ব্যাপক তল্লাশি' চালানো হচ্ছে এবং এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে এবং সেনাবাহিনী এই বিষয়ে সার্বক্ষণিক আপডেট দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে আসলে কী রয়েছে?
১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকের মূল ভিত্তি হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ এবং এর বিনিময়ে তেহরানের ওপর থেকে ধাপে ধাপে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা।
এবারের দোহা আলোচনায় কারিগরি বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমানো, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের পূর্ণ প্রবেশাধিকার দেওয়া এবং ইরানের জব্দকৃত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিল ছাড় করা। ওআইসি এবং কাতার এই চুক্তির মধ্যস্থতায় বড় ভূমিকা পালন করছে।
ইসরায়েল কি এই চুক্তি নস্যাৎ বা সাবোটাজ করতে পারে?
এই চুক্তির সবচেয়ে বড় বিরোধী পক্ষ হলো ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ও সামরিক নেতৃত্ব বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইরানের সাথে যেকোনো ধরনের শিথিল চুক্তি তারা মেনে নেবে না। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বর্তমান সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং গাজা ও লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা জিইয়ে রাখার পেছনে একটি বড় উদ্দেশ্য হলো এই শান্তি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করা।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইসরায়েল যদি ইরানের অভ্যন্তরে কোনো গোপন পরমাণু কেন্দ্রে বা পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের ওপর গুপ্ত হামলা চালায়, তবে এই পুরো সমঝোতা প্রক্রিয়াটি মুহূর্তের মধ্যে ভেস্তে যেতে পারে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য এমন এক সুতোয় ঝুলছে যেখানে একদিকে চলছে শান্তির জন্য কূটনৈতিক টেবিলের দরকষাকষি, আর অন্যদিকে মাঠে চলছে রক্তক্ষয়ী সামরিক আগ্রাসন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই 'ইতিবাচক অগ্রগতি' শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ শান্তিতে রূপ নেয় নাকি ইসরায়েলি বাধায় আবার যুদ্ধের দাবানল জ্বলে ওঠে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন