দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তসংলগ্ন শহর নাকোরার বাসিন্দা আলী (ছদ্মনাম) ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন তাঁর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁর চোখে ছিল পুনর্গঠনের স্বপ্ন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে সে সময় শহরটি থেকে সাময়িকভাবে পিছু হটেছিল।
তবে যাওয়ার আগে তারা রেখে গিয়েছিল বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়া অসংখ্য ঘরবাড়ি, গ্রাফিতিতে ভরা স্কুল এবং মাটির নিচ থেকে উপড়ে ফেলা বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের তার। আলীর নিজের বাড়ির ভিত্তিপ্রস্তরেও ফাটল ধরেছিল, উপড়ে ফেলা হয়েছিল তাঁর সযত্নে লাগানো ফলের গাছগুলো। বয়োবৃদ্ধ আলী তখন বুকভরা আশা নিয়ে বলেছিলেন, তিনি নিজের হাতে আবার সবকিছু ঠিকঠাক করবেন।
কিন্তু এর ঠিক এক বছর পর, ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে এসে আলীর সেই স্বপ্ন আজ পুরোপুরি ধূলিসাৎ। দক্ষিণ লেবাননের নাকোরাসহ আরও বহু শহর ও গ্রামকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বোমা মেরে এবং বুলডোজার দিয়ে সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, যা এখন সম্পূর্ণরূপে বসবাসের অযোগ্য।
গত মার্চ মাসে ইসরায়েল যখন লেবাননে পুনরায় পুরোদমে স্থল অভিযান শুরু করে, তখন আলী তাঁর সমুদ্রের ধারের পৈতৃক বাড়ি ও সুন্দর বাগান ফেলে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। আজ তাঁর ঠিকানা বৈরুতের কেন্দ্রস্থলের একটি বহুতল ভবনের ছাদের ওপর ছোট্ট একটি ঘর।
সেখানে বসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলী স্মৃতিচারণ করলেন, আমরা ২০টি ভালো বছর কাটিয়েছিলাম। আলী মূলত ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান এবং ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর নতুন করে সীমান্ত সংঘাত শুরু হওয়ার মধ্যবর্তী অপেক্ষাকৃত শান্ত সময়টুকুর কথা বলছিলেন।
আলীর মতো হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত লেবাননি নাগরিকের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। নিজেদের বাড়িঘর ও সহায়-সম্বল হারানোর বেদনা তো আছেই, তবে মনোবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন যে, এই যুদ্ধ যখনই থামুক না কেন, এই মানুষগুলো যখন তাঁদের চেনা গ্রামে ফিরবেন, তখন তাঁদের ওপর আরও বড় ধরনের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় নেমে আসবে। কারণ, সেখানে ফেরার পর তাঁরা তাঁদের চেনা অতীতের কোনো চিহ্নই আর খুঁজে পাবেন না।
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) কর্মকর্তা বাসমা আলোশ আল জাজিরাকে বলেন, যখন একটি পুরো গ্রাম মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়, এমনকি তার চারপাশের পরিচিত ল্যান্ডমার্ক বা ঐতিহাসিক চিহ্নগুলোও ধ্বংস করে দেওয়া হয়, তখন মানুষ কেবল তার বাড়ি হারায় না, সে তার অস্তিত্ব এবং পরিচয়ের মূল ভিত্তিটিই হারিয়ে ফেলে। এই কারণেই আমরা এখন এমন মানুষের মধ্যেও তীব্র মানসিক ট্রমা ও বিষণ্ণতা দেখতে পাচ্ছি, যারা এর আগে কখনো কোনো ধরনের মানসিক সমস্যায় ভোগেননি।
বাসমা আলোশ আরও যোগ করেন, অনেকের জন্যই এটি শৈশবের শারীরিক স্মৃতিগুলো চিরতরে হারিয়ে ফেলার মতো- যে গাছটার নিচে তারা বড় হয়েছে, যে রাস্তায় তারা শৈশবে খেলেছে কিংবা যে ঘরটিতে একটি পুরো জীবনের স্মৃতি জমা ছিল, তার সবকিছুই এখন হাওয়া। এই ধরনের শোক বা বেদনা কাটানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ স্থানটি ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথে মনে হয় যেন তাদের অতীতটাই ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননের লিটানি নদীর তীরে একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত বফোর্ট ক্যাসেল বা কালাত আল-শাকিফ হলো দ্বাদশ শতাব্দীর একটি ঐতিহাসিক দুর্গ। কৌশলগতভাবে এই দুর্গের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকে পুরো দক্ষিণ লেবানন এবং উত্তর ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ওপর নজর রাখা যায়।
ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে ১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধের সময়, ইসরায়েলি বাহিনী এবং ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের মধ্যে এই দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল। চলমান সংঘাতের মধ্যেও এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এবং এর আশেপাশের এলাকা ইসরায়েলি বিমান হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, যা লেবাননের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।
হিজবুল্লাহ কি দুর্বল হয়ে পড়েছে?
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তাদের লাগাতার বিমান হামলা এবং স্থল অভিযানের কারণে হিজবুল্লাহর চেইন অফ কমান্ড এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি দুর্বল করা সহজ নয়।
গেরিলা যুদ্ধপদ্ধতিতে অভ্যস্ত এই গোষ্ঠীটি দক্ষিণ লেবাননের ভূগর্ভস্থ টানেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এখনও ইসরায়েলি সেনাদের ওপর পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। ফলে লেবাননের বেসামরিক অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস হলেও, হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা কমেছে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এখনও বিতর্ক রয়েছে।
কেন ইসরায়েল নাবাতিয়েহ (Nabatieh) শহরে বারবার হামলা চালাচ্ছে?
নাবাতিয়েহ হলো দক্ষিণ লেবাননের একটি অন্যতম প্রধান এবং জনবহুল শহর। এটি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ইসরায়েলের অভিযোগ, নাবাতিয়েহ শহরটিকে হিজবুল্লাহ তাদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি, অস্ত্রাগার এবং কমান্ড সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করছে।
তবে লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নাবাতিয়েহর বেসামরিক আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল এবং বাজারগুলোতে হামলা চালিয়ে মূলত লেবাননের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে শহর ছাড়তে বাধ্য করাই ইসরায়েলের মূল সামরিক কৌশল।
চলমান এই সংঘাতের মাঝে আন্তর্জাতিক মহলে এক নতুন কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি পরমাণু ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছিল। তবে মাঠের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। লেবাননে ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি এবং একের পর এক গ্রাম ধ্বংস করার এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া শান্তি প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অনেকে মনে করছেন, বর্তমানে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যে ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কোনো স্থায়ী সমাধানের দিকে যাচ্ছে না, বরং এটি ভবিষ্যতের আরও বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করছে।
বাস্তুচ্যুত আলী কিংবা দক্ষিণ লেবাননের লাখো মানুষের জন্য এই ভূরাজনীতি কেবলই কিছু সংখ্যার খেলা।
তাদের কাছে নির্মম সত্য এটাই যে, যে ঘর, যে আঙিনা আর যে পরিচয়কে কেন্দ্র করে তাদের জীবন আবর্তিত হতো, তা আজ শুধুই কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ আর কালো ধোঁয়ায় হারিয়ে গেছে। ফিজিক্যাল বা বাহ্যিক পুনর্গঠন হয়তো কোনোদিন সম্ভব হবে, কিন্তু লেবাননের এই প্রজন্মের মনের ভেতর যে স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত তৈরি হচ্ছে, তা কাটিয়ে ওঠা আগামী কয়েক দশকেও সম্ভব নাও হতে পারে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন