ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যকার সম্পর্কে নজিরবিহীন ফাটল ধরেছে। ওয়াশিংটনের যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্তে রিয়াদ চরম ক্ষুব্ধ হওয়ায় এবার সৌদি আরব থেকে মার্কিন সেনা কমিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে হোয়াইট হাউস। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের একটি গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে, ইরান যুদ্ধের জেরে দুই দেশের সম্পর্কের পারদ এখন তলানিতে ঠেকেছে। মূলত হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে বের করে আনার লক্ষ্যে মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে এক বিশাল সামরিক অভিযান চালুর ঘোষণা দিয়েছিল। এই অভিযানে সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের জরুরি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তেহরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর আশঙ্কায় সৌদি আরব মার্কিন বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানায়। রিয়াদের এমন অনড় অবস্থানের কারণে ওয়াশিংটন তাদের গুরুত্বপূর্ণ এই সামরিক পরিকল্পনা মাঝপথে স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
সৌদি আরবের এই স্বাধীন সিদ্ধান্তে চরম ক্ষুব্ধ হয় মার্কিন প্রশাসন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ক্ষোভের মুখে হোয়াইট হাউস রিয়াদের কাছে অত্যন্ত জরুরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ‘ইন্টারসেপ্টর’ সরবরাহ বন্ধের হুমকি পর্যন্ত দেয়। উল্লেখ্য, সৌদি আরব এই মার্কিন ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ভূপাতিত করে আসছিল।
মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই অসহযোগিতার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসসহ সৌদিতে থাকা তাদের প্রায় ২,৩০০ মার্কিন সেনার উপস্থিতি কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। এই সেনাদের মূলত ইসরায়েল ও জর্ডানের মতো আরও বেশি সহযোগিতাপূর্ণ দেশে পুনর্বাসন করা হতে পারে।
দুই দেশের এই কূটনৈতিক টানাপড়েন সম্প্রতি আরও স্পষ্ট হয়েছে। গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপসাগরীয় অঞ্চলের সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন সফর করলেও সৌদি আরবকে পুরোপুরি এড়িয়ে যান। রিয়াদ এটিকে স্পষ্ট ‘কূটনৈতিক অবজ্ঞা’ হিসেবে দেখছে। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতি সত্ত্বেও অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই সৌদি আরব ট্রাম্প প্রশাসনকে সামরিক অভিযান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল। রিয়াদের মূল শঙ্কা ছিল, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাতের এই চেষ্টা সফল না হলে তেহরান হরমুজ প্রণালি চিরতরে বন্ধ করে দেবে; যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের পাল্টা হামলায় সৌদি আরবের একাধিক জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে রিয়াদ দ্রুত যুদ্ধের উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা যুদ্ধনীতির কারণে ১৯৪৫ সাল থেকে গড়ে ওঠা মার্কিন-সৌদি ঐতিহাসিক নিরাপত্তা চুক্তি এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন