ভয়াবহ ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড ভেনেজুয়েলায় ঘটল এক অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক ঘটনা। দুর্যোগের দীর্ঘ আট দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একজনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারীরা। টানা ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষে ৪৩ বছর বয়সী হার্নান গিল নামের ওই ব্যক্তিকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনা সম্ভব হয়। গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই, ২০২৬) স্থানীয় সময় লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যের উপকূলীয় শহর ক্যাটিয়া লা মার থেকে তাঁকে উদ্ধার করা হয় বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
গত ২৪ জুন ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানে পরপর দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার বহু বহুতল ভবন ধসে মাটির সাথে মিশে গেছে।
উদ্ধারকারীরা জানান, ভূমিকম্পের সময় হার্নান গিল ‘গালেরিয়াস প্লায়া গ্রান্দে’ শপিংমলের পাশে একটি সাততলা ভবনের বেজমেন্টে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে ডিউটি করছিলেন। ভবনটি সম্পূর্ণ ধসে পড়লেও তিনি যে ছোট কংক্রিটের কক্ষে ছিলেন, সেটি অলৌকিকভাবে সুরক্ষিত থাকে। তবে তাঁর মাথার ওপর জমে ছিল প্রায় ১৪০ টন ওজনের কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ। গত রোববার কোস্টারিকার রেড ক্রসের প্যারামেডিক অ্যালান মাদ্রিগাল প্রথম ধ্বংসস্তূপের গভীর থেকে এক ক্ষীণ কণ্ঠের আর্তনাদ শুনতে পান। প্রথমে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পারলেও পরে সহকর্মীদের নিয়ে নিশ্চিত হন যে ভেতরে কেউ বেঁচে আছেন। এরপরই শুরু হয় সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলের যৌথ ‘মিশন’।
ভেনেজুয়েলা, চিলি, কোস্টারিকা, এল সালভাদর, মেক্সিকো, পর্তুগাল ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষ উদ্ধারকর্মীরা যৌথভাবে এই জটিল অভিযানে অংশ নেন। চিলির এক অভিজ্ঞ দমকলকর্মী এটিকে তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল উদ্ধার অভিযান হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। উদ্ধারকাজের সময় সুরঙ্গ তৈরি করতে গিয়ে কয়েকবার তা ধসে পড়ে উদ্ধারকারীদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। তবে দমে না গিয়ে ছোট একটি ছিদ্র দিয়ে প্রথমে গিলের কাছে পানি, স্যালাইন ও ধুলাবালি থেকে বাঁচার জন্য মাস্ক ও সুরক্ষাচশমা পৌঁছে দেওয়া হয়। একটি ছোট অ্যান্ডোস্কোপিক ক্যামেরা ভেতরে ঢুকিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।
মেক্সিকোর রেড ক্রসের সদস্য মার্কো আন্তোনিও ফ্রাঙ্কো জানান, আট দিন ধরে অন্ধকার কবরের মতো জায়গায় আটকে থেকেও গিল পুরোটা সময় অত্যন্ত আশাবাদী ও প্রাণবন্ত ছিলেন। তিনি নিয়মিত উদ্ধারকারীদের সাথে কথা বলতেন, নিজের পরিবারের খোঁজ নিতেন এবং উদ্ধারকর্মীদের উৎসাহ দিতেন। এমনকি মাঝেমধ্যে নিজের পছন্দের স্বাদের হাইড্রেশন ড্রিংকও চেয়ে খেতেন।
উদ্ধারের পর প্যারামেডিক অ্যালান মাদ্রিগাল উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “তিনি প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ ও অক্ষত অবস্থাতেই স্বাভাবকিভাবে হেঁটে বেরিয়ে এসেছেন। এক সপ্তাহ আগে আমি যে মানুষটি এই অভিযানে এসেছিলাম, কোস্টারিকায় ফিরে যাওয়ার সময় আমি আর সেই আগের মানুষটি থাকব না। এই অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা আমাকে ভেতর থেকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।”
ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে এই ভূমিকম্পকে অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অলৌকিক এই ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অন্যান্য সম্ভাব্য জীবিতদের খুঁজে বের করতে হাজারো উদ্ধারকর্মী নতুন উদ্যমে তাঁদের তল্লাশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন