অবরুদ্ধ গাজায় প্রথম আরব নেতা, ইতিহাসে শেখ হামাদের অনন্য অধ্যায়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম
অবরুদ্ধ গাজায় প্রথম আরব নেতা, ইতিহাসে শেখ হামাদের অনন্য অধ্যায়

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার দীর্ঘস্থায়ী ইসরায়েলি অবরোধ ভেঙে ইতিহাস গড়া প্রথম আরব রাষ্ট্রপ্রধান এবং কাতারের সাবেক আমির (ফাদার আমির) শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানির প্রয়াণে গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় নিমজ্জিত পুরো ফিলিস্তিন।

রোববার তাঁর মৃত্যুর পর বিশ্বরাজনীতিতে তাঁর অবদান, বিশেষ করে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার রক্ষায় তাঁর আপসহীন ও ঐতিহাসিক ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি কেবল একজন দূরদর্শী আঞ্চলিক রাষ্ট্রনায়কই ছিলেন না, বরং ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে বুড়ো আঙুল দেখানো এক সাহসী বীর হিসেবে স্মরিত হচ্ছেন।

২০০৬ সালের ফিলিস্তিন নির্বাচনের পর যখন ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তিগুলো গাজা উপত্যকার ওপর এক কঠোর, অমানবিক ও পঙ্গু করে দেওয়ার মতো অবরোধ আরোপ করে, তখন সমগ্র বিশ্ব ও অধিকাংশ আরব নেতৃত্ব ফিলিস্তিনিদের মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। সেই চরম সংকটের মুহূর্তে, ২০১২ সালের অক্টোবরে, প্রথম এবং একমাত্র আরব নেতা হিসেবে সশরীরে গাজা সফর করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন শেখ হামাদ।

২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর। গাজা সিটি তখন আক্ষরিক অর্থেই এক অবরুদ্ধ নগরী। চারিদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কড়া নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল। এমন এক থমথমে পরিস্থিতিতে কাতারের তৎকালীন আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি তাঁর পত্নী শেইখা মোজা বিন্ত নাসের এবং একটি উচ্চপর্যায়ের কাতারী প্রতিনিধিদল নিয়ে সরাসরি গাজা উপত্যকায় প্রবেশ করেন।

পশ্চিমা পরাশক্তি ও আঞ্চলিক কিছু দেশের তৈরি করা রাজনৈতিক দেওয়াল ভেঙে তাঁর এই আগমন ফিলিস্তিনিদের মাঝে এক অভূতপূর্ব আশার আলো সঞ্চার করেছিল। গাজায় পৌঁছানোর পর কাতারের আমিরকে রাষ্ট্রীয় ও অভূতপূর্ব গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়।

এই ঐতিহাসিক সফর প্রসঙ্গে হামাসের প্রবাসী রাজনৈতিক শাখার প্রধান খালেদ মিশাল আল জাজিরাকে বলেন, আমিরের প্রয়াণে আজ জেরুজালেম, গাজা এবং সমগ্র ফিলিস্তিন শোকাহত। তিনি ছিলেন গাজা সফরকারী প্রথম আরব ও মুসলিম নেতা। অত্যন্ত বীরত্ব, সাহসিকতা ও মহানুভবতার সাথে তিনি গাজাবাসীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর সেই সফরটি ছিল মূলত অন্ধকারতম পরিস্থিতিতে গাজার ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহারের এক আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য ঘোষণা। তিনি ছিলেন একাধারে বুদ্ধিমান, সাহসী এবং নীতিবান একজন মানুষ।

প্রবীণ সাংবাদিক এবং আল জাজিরা অ্যারাবিক চ্যানেলের সাবেক সংবাদ পরিচালক আহমেদ আল-শেখ এক সাক্ষাৎকারে মরহুম আমিরের ফিলিস্তিন প্রেমের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ফিলিস্তিনের প্রতি শেখ হামাদের ভালোবাসা ছিল অন্যরকম, একেবারে অন্য স্তরের। সমগ্র আরব বিশ্বে হামাদ বিন খলিফা ছাড়া আর কোনো নেতা কি গাজায় যাওয়ার সাহস দেখিয়েছেন? তিনি গাজায় গিয়েছিলেন কারণ তিনি দেখেছিলেন যে চারপাশের সবাই গাজাকে অবহেলা করছে ও একাকী ফেলে দিয়েছে।

২০১২ সালের সেই ল্যান্ডমার্ক সফরের সময় শেখ হামাদ কেবল মৌখিক সহানুভূতি প্রকাশ করেননি, বরং গাজার ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতি ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য কাতার সরকারের পক্ষ থেকে পূর্বে ঘোষিত ২৫৪ মিলিয়ন ডলারের অনুদান বাড়িয়ে একলাফে '৪০০ মিলিয়ন ডলারে, উন্নীত করেন।

এই বিশাল অর্থায়নের মাধ্যমে গাজায় আধুনিক আবাসন, উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়, যা পরবর্তী এক দশকে লাখ লাখ ফিলিস্তিনির জীবনযাত্রার মান বদলে দিয়েছিল।

গাজা ইসলামিক ইউনিভার্সিটি-যা শেখ হামাদ এবং শেইখা মোজাকে ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছিল-সেখানে এক বিশাল জনসমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় আমির ফিলিস্তিনিদের অদম্য সহনশীলতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সাথে তিনি ফিলিস্তিন ইস্যুতে পশ্চিমা বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘দ্বিমুখী নীতি’ (Double Standards)-র তীব্র সমালোচনা করেন।

ফিলিস্তিন ও জেরুজালেমের প্রতি শেখ হামাদের এই নিখাদ প্রতিশ্রুতি গাজা অবরোধের অনেক আগে থেকেই দৃশ্যমান ছিল। ১৯৯৯ সালে, যখন ফিলিস্তিন-ইসরায়েল শান্তি প্রক্রিয়া এক গভীর রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছিল, তখন ১৯৬৭ সালের পর প্রথম কোনো উপসাগরীয় (Gulf) নেতা হিসেবে শেখ হামাদ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড সফর করেন এবং রামাল্লায় ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাতের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

আহমেদ আল-শেখের মতে, শেখ হামাদ ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামকে নিজের ব্যক্তিগত বেদনার লেন্স দিয়ে দেখতেন। সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন যখন রামাল্লায় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতের সদর দফতর ‘মুকাতেয়া’ (Muqata'a) অবরুদ্ধ করেছিলেন, তখন কাতারের আমির তীব্র ক্ষোভ ও যন্ত্রণায় ভুগেছিলেন। তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বলেছিলেন, শ্যারন যখন মুকাতেয়ায় আক্রমণ করছে, তখন তাঁর মনে হচ্ছে যেন শ্যারন সরাসরি কাতারের ওপরই আক্রমণ চালাচ্ছে।

জেরুজালেমের (আল-কুদস) পবিত্র ভূমির প্রতি তাঁর টান ছিল গভীর। ১৯৬৭ সালের জুনে ইসরায়েলি দখলের আগে তিনি কখনো জেরুজালেম ভ্রমণ করতে পারেননি-এই আক্ষেপ তাঁর মনে আজীবন ছিল। এই আক্ষেপ থেকে তিনি জেরুজালেমের দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ফিলিস্তিনি পরিচয় ধরে রাখার জন্য একটি বিশেষ তিন ঘণ্টার দীর্ঘ তথ্যচিত্র নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

শেখ হামাদ বিশ্বাস করতেন, ফিলিস্তিনের মুক্তি কোনো বাইরের আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আসবে না, বরং এর চাবিকাঠি ফিলিস্তিনিদের নিজেদের হাতেই রয়েছে। তিনি ফিলিস্তিনিদের এই আন্দোলনের ‘অগ্রভাগ’ (Spearhead) হিসেবে বিবেচনা করতেন। আহমেদ আল-শেখকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমির বলেছিলেন, মূল পদক্ষেপটি আপনাদের (ফিলিস্তিনিদের) নিজেদেরই নিতে হবে। ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব প্রতিরোধ ও প্রচেষ্টা ছাড়া কোনো মুক্তি আসতে পারে না।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে কাতারের এই কট্টর অবস্থান অনেক সময়ই তাদের উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC) এবং অন্যান্য আরব প্রতিবেশীদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়াতে বাধ্য করেছিল। ২০০৮-২০০৯ সালে যখন ইসরায়েল গাজায় ভয়াবহ ও নৃশংস সামরিক অভিযান চালায়, তখন জিসিসি ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত তা নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।

সেই সংকটময় মুহূর্তে শেখ হামাদ দোহায় একটি জরুরি আরব শীর্ষ সম্মেলনের আহ্বান জানান। তিনি গাজা পুনর্গঠনের জন্য ২৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠন এবং ইসরায়েলি অবরোধ এড়াতে একটি সরাসরি সমুদ্র করিডোর (Maritime Corridor) চালুর প্রস্তাব করেছিলেন। তবে অনেক আরব দেশের অনীহার কারণে সেই বৈঠকে প্রয়োজনীয় কোরাম পূর্ণ হয়নি। এতে হতাশ হয়ে আমির সরাসরি লাইভ টেলিভিশনে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে কোরআনের আয়াত উচ্চারণ করে বলেছিলেন, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের চলমান ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত গাজা উপত্যকার প্রধান প্রধান আধুনিক অবকাঠামোগুলো ছিল শেখ হামাদের আর্থিক প্রতিশ্রুতিরই ফসল।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো, ১.শেখ হামাদ সিটি (খান ইউনিস)এটি ছিল মধ্য ও নিম্নবিত্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য নির্মিত ৫৮ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল পাবলিক আবাসন প্রকল্প। এখানে ৫৩টি আধুনিক বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে হাজার হাজার পরিবার সুন্দরভাবে বসবাস করছিল।

২.প্রধান মহাসড়কসমূহ, গাজার যোগাযোগ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত সালাহ আল-দিন হাইওয়েসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর আধুনিকীকরণ কাতারের অর্থায়নেই সম্পন্ন হয়।

৩.শেখ হামাদ হাসপাতাল (গাজা সিটি)২০১৯ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড প্রোস্থেটিক্স (কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন) হাসপাতালটি ছিল সমগ্র ফিলিস্তিনের মধ্যে পঙ্গু, অঙ্গহানি হওয়া মানুষ এবং শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসার একমাত্র ও সেরা বিশেষায়িত হাসপাতাল।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের ভয়াবহ সামরিক অভিযানে গাজা উপত্যকায় কাতারের অর্থায়নে তৈরি হওয়া অধিকাংশ ঐতিহাসিক স্থাপনা ও অবকাঠামো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসের সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্র নিশ্চিত করেছে যে, খান ইউনিসের দৃষ্টিনন্দন 'হামাদ সিটি' সহ কাতারি সহায়তায় নির্মিত বিস্তীর্ণ এলাকা এখন সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ এবং মানচিত্র থেকে মুছে গেছে।

তবে চরম ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও টিকে রয়েছে শেখ হামাদের মানবিক দূরদর্শিতার প্রতীক ‘শেখ হামাদ হাসপাতাল’। সরাসরি হামলা, তীব্র জ্বালানি সংকট ও গাজার চিকিৎসা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পতনের মধ্যেও এই হাসপাতালটি উত্তর গাজায় তার সীমিত সেবা চালু রাখতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে উত্তর গাজায় চালু থাকা একমাত্র সিটি স্ক্যান (CT Scanner) মেশিনটি এই হাসপাতালেই রয়েছে। এছাড়া যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে গাজায় কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপনের (Amputation) হার ২২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায়, হাসপাতালটি দক্ষিণ গাজায় তাদের একটি নতুন শাখা চালু করেছে যাতে যুদ্ধাহত শিশুদের পুনর্বাসন করা যায়।

বাস্তুচ্যুত, অবরুদ্ধ এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের শিকার গাজাবাসীর কাছে শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানির নাম কেবল কাতারের একজন সাবেক আমিরের নাম নয়; বরং তিনি ছিলেন বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো এক পরম বন্ধু। গাজার মাটিতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রতিটি ইটের কণা এবং এখনো সচল থাকা কাতারি হাসপাতালের প্রতিটি চিকিৎসা সেবা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে শেখ হামাদের অনন্য ও যুগান্তকারী অবদানের কথা আগামী বহু প্রজন্ম ধরে স্মরণ করিয়ে দেবে।

জেএইচআর