বাতাস যা একসময় ছিল জীবনের প্রতীক, এখন সেটিই হয়ে উঠেছে মৃত্যুর আশঙ্কা। পৃথিবীর সবচেয়ে বায়ুদূষিত শহরের তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা প্রায়ই স্থান করে নেয় শীর্ষ পাঁচে। কখনও তৃতীয়, কখনও চতুর্থ বা পঞ্চম স্থানে-তালিকার অবস্থান বদলায়, কিন্তু সত্য একটাই: ঢাকার বাতাস বিষাক্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ এমন বায়ু শ্বাস নিচ্ছে যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। PM2.5 বা সূক্ষ্ম ধূলিকণার মাত্রা প্রতিনিয়তর WHO অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করছে। ২০২৪ সালে Dhaka ছিল বিশ্বের তৃতীয় দূষিত নগর, আর ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে কখনো চতুর্থ, কখনো পঞ্চম স্থানে দেখা গেছে। এই ওঠানামা কোনো উন্নতির চিহ্ন নয়-এ এক শ্বাসরুদ্ধ নগরজীবনের প্রতিচ্ছবি।
যানবাহনের ধোঁয়া ও ট্রাফিক জট: ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখেরও বেশি যানবাহন চলাচল করে। এর অর্ধেকেরও বেশি পুরনো, রক্ষণাবেক্ষণবিহীন এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী। ট্রাফিক জটের কারণে একই যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইঞ্জিন চালিয়ে রাখে, ফলে নির্গমন হয় বিপুল পরিমাণ নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও ক্ষুদ্র ধূলিকণা।
ইটভাটা: নির্মম দূষণের কারখানা: বলা হয়, ঢাকার বাতাসের ৫৫-৬০ শতাংশ দূষণ আসে ইটভাটা থেকে। রাজধানী ও আশপাশে রয়েছে তিন হাজারেরও বেশি ভাটা, যেগুলোর অধিকাংশই পুরনো প্রযুক্তির। কয়লা, কাঠ, এমনকি টায়ার পুড়িয়ে ইট পোড়ানো হয়-ফলাফল: বিষাক্ত ধোঁয়া, ধূলা ও গ্যাস।
নির্মাণকাজ ও নগর ধুলো: ঢাকার প্রায় প্রতিটি রাস্তাই এখন মেরামত বা উন্নয়নের অধীনে। খোলা বালু, ভাঙা ইট, সিমেন্টের ধুলো-সব মিশে বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। নির্মাণকাজে ধুলো আটকানোর নেট ব্যবহার হয় না, রাস্তা পরিস্কার করা হয় না। প্রতিদিন লাখো মানুষ ধুলা গিলে অফিসে যায়, স্কুলে যায়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলা ও পুড়িয়ে ফেলার কারণে বায়ুতে যুক্ত হচ্ছে ডাইঅক্সিন ও ফিউরান নামের বিষাক্ত যৌগ, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ভৌগোলিক প্রভাব: বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও একে বিপদে ফেলেছে। শুষ্ক মৌসুমে বাতাসের আর্দ্রতা কমে, বাতাসের গতিও হয় স্থবির। ফলে ধুলো, ধোঁয়া ও ক্ষুদ্রকণিকা বাতাসে ভেসে থাকে দীর্ঘ সময়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সামাজিক প্রভাব: বায়ুদূষণ আজ কেবল পরিবেশগত নয়, জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ু দূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২ লাখ মানুষ অকালমৃত্যুবরণ করে। শ্বাসযন্ত্র, হৃদরোগ, স্ট্রোক, অ্যাজমা, ক্যান্সার-সবই এই দূষণের দীর্ঘ ছায়া।
শিশুদের ফুসফুসের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, গর্ভবতী নারীদের জটিলতা বাড়ছে, কর্মক্ষম মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আর্থিকভাবে এর ক্ষতি প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা আমাদের জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ।
সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা: সরকারের বিভিন্ন সংস্থা যেমন পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE), ঢাকা সিটি করপোরেশন, এবং পরিবহন কর্তৃপক্ষ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে- ইটভাটা বন্ধ বা আধুনিকায়ন, নির্দিষ্ট অঞ্চলে ধুলো-নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো, যানবাহনে নির্গমন মানদণ্ড নির্ধারণ, জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা (২০২৪–২০৩০) প্রণয়ন।
কিন্তু এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। আইনের প্রয়োগ দুর্বল, জরিমানা অল্প, তদারকি সীমিত। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রক্ষা পায়। ফলে পদক্ষেপের ফলাফল নগণ্য।
নাগরিক দায়বদ্ধতা: শুধুই সরকারের কাজ নয়, ঢাকার মানুষ নিজেরাও অনেক সময় দূষণের অংশীদার হয়ে পড়ে অজান্তে। আমরা প্রতিদিন গাড়ি ধুই রাস্তার পাশে, নির্মাণকাজে বালু খোলা রাখি, আবর্জনা পুড়াই, কিংবা গাছ কেটে ফাঁকা জায়গায় দোকান বসাই। এই অচেতন অভ্যাস বদলাতে হবে।
ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার, রাস্তায় আবর্জনা না পোড়ানো, বাড়ির ছাদে গাছ লাগানো, শিশুদের পরিবেশ শিক্ষা দেওয়া এসব ছোট ছোট পদক্ষেপই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
আইন ও প্রয়োগ শক্তিশালী করা: পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ইটভাটা, যানবাহন ও শিল্প কারখানার নির্গমনের জন্য কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
নির্মাণ ও রাস্তায় ধুলো নিয়ন্ত্রণ: প্রতিটি বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে ধুলা নিয়ন্ত্রণে 'নেট কাভার' বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং সিটি করপোরেশনকে দৈনিক রাস্তা পরিষ্কারের জন্য আধুনিক মেশিন ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে।
সবুজ অবকাঠামো: গাছ কাটা নয়, বরং 'গ্রিন করিডর' গড়ে তোলা উচিত। ছাদ বাগান, ঝুলন্ত উদ্যান, এবং রাস্তার পাশে গাছ লাগানো শহরকে বাঁচাতে পারে।
গণসচেতনতা ও শিক্ষা: স্কুল-কলেজে পরিবেশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হোক। মিডিয়া, টেলিভিশন, সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ধারাবাহিক প্রচারণা চলুক 'পরিষ্কার বাতাস আমাদের অধিকার স্লোগানে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: জাতিসংঘের 'Clean Air Initiative 'বা WHO-র 'Urban Health Program'-এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাড়াতে হবে। টেকসই প্রযুক্তি বিনিয়োগে বিদেশি সহযোগিতা আহ্বান করা জরুরি।
নীতিগত সংস্কারের দাবি: বায়ুদূষণ শুধু পরিবেশের নয়, উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়। আমাদের বাজেট, নগর নীতিমালা ও শিল্পায়ন সবখানেই 'পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়ন' বাধ্যতামূলক করতে হবে। রাজধানীর উন্নয়ন পরিকল্পনা (DMDP) ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নীতিতে 'পরিবেশ সংবেদনশীল' দৃষ্টিভঙ্গি সংযোজন অপরিহার্য।
আশার আলো: তবুও নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। ঢাকায় ইতিমধ্যে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা গেছে।
হেমায়েতপুর এলাকায় আধুনিক Zigzag ভাটায় রূপান্তর, নগর সবুজায়নে 'ঢাকা গ্রীন করিডর প্রজেক্ট' পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন (ইলেকট্রিক বাস) চালুর উদ্যো এসবই সঠিক পথে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
যদি নাগরিক সহযোগিতা ও প্রশাসনিক সততা বজায় থাকে, তাহলে ঢাকা আবারও শ্বাস নিতে পারবে।
ঢাকার আকাশ এখন সীসা, ধোঁয়া আর ধুলায় ঢাকা। কিন্তু এই শহর একসময় ছিল সবুজ, শান্ত, প্রাণবন্ত। সেই নগরী ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়-যদি আজই আমরা একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেই: পরিষ্কার বাতাস কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার।
আমরা যদি এখনই কাজ না করি, আমাদের সন্তানরা হয়তো একদিন মুখোশ পরেই জন্ম নেবে, গাছের নিচে নিঃশ্বাস নিতে পারবে না। সময় ফুরিয়ে আসছে-ঘড়ির কাঁটা আর শ্বাসের তাল একই সুরে বাজছে।
প্রশ্ন একটাই: আমরা কি সেই শেষ ঘণ্টাধ্বনি শুনে কেবল আতঙ্কিত হব, নাকি পরিবর্তনের ঘণ্টা বাজিয়ে ঢাকাকে ফিরিয়ে আনব তার নীল আকাশে?
বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি পরিবর্তনের শুরু একটি নিঃশ্বাস থেকেই।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন