বাঙালির জাতিসত্তা ও ভাষার লড়াইয়ের মর্মমূল যেখানে ‘জয় বাংলা’, সেখানে বর্তমান প্রজন্মের মুখে ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’র মতো শব্দের আস্ফালন দেখে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু)। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বাংলা ভাষাকে হৃদয়ে ধারণ করতে হলে এই ভিনদেশি ও ঐতিহাসিক শত্রুভাবাপন্ন শব্দমালার সংস্কৃতি থেকে তরুণ সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘আমার রক্তক্ষরণ হয়’: জেন-জি’র ভাষা নিয়ে আক্ষেপ
সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিদ্যুৎমন্ত্রী বর্তমান সময়ের আলোচিত ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের শব্দচয়ন নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, আজকের তরুণরা যখন রাজপথে ‘ইনকিলাব’ (বিপ্লব) স্লোগান দেয়, তখন আমার ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়। প্রশ্ন জাগে, এই শব্দগুলো শোনার জন্যই কি আমরা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম? আমরা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম, কিন্তু আজ দেখছি সমাজ পেছনের দিকে হাঁটছে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মূল সুরই ছিল নিজের মায়ের ভাষাকে রক্ষা করা। কিন্তু বর্তমানে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ বা ‘আজাদি’র মতো শব্দের যে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা বাংলার মূল চেতনার সঙ্গে চরমভাবে সাংঘর্ষিক।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে মন্ত্রী নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে সম্ভাব্য সমালোচনার জবাবও অগ্রিম দিয়ে রাখেন। তিনি বলেন, সত্য কথা বললে এ দেশে ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতি শুরু হয়।
"আমি জানি, এসব কথা বলার পর অনেকেই আমাকে ‘ভারতের দালাল’ কিংবা ‘র’-এর এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম একটি স্বাধীন ও স্বকীয় সংস্কৃতির দেশের জন্য। সেই চেতনা থেকেই বলছি—ইনকিলাব বা জিন্দাবাদ স্লোগান আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চাওয়াদের ভাষা। যারা দেশকে ভালোবাসে, তাদের অবশ্যই নিজেকে এই অপসংস্কৃতি থেকে পরিশুদ্ধ করতে হবে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মনে করেন, বর্তমানে জাতি হিসেবে আমাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো শেকড় ও ভাষার ইতিহাসের প্রতি অবজ্ঞা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাঙালির নিজের ভাষা ও তার বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে কোনো যত্ন নেই।
যে জাতি নিজের অতীত ও ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ, তারা কখনও প্রকৃত উন্নতি করতে পারে না। আমরা ভাষাকে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রেখেছি, গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করিনি। আর এই ব্যর্থতার কারণেই আমাদের মধ্যে বলিষ্ঠ জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠছে না।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় জেলা পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন:
* সাইফুল ইসলাম: পুলিশ সুপার, সিরাজগঞ্জ।
* মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম: উপপরিচালক, স্থানীয় সরকার বিভাগ।
* সাইদুর রহমান: প্রেসিডেন্ট, সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এবং সাধারণ সম্পাদক, জেলা বিএনপি।
বক্তারা একুশের চেতনাকে কেবল ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভা শেষে স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় দেশাত্মবোধক গান ও কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানানো হয়।
বিদ্যুৎমন্ত্রীর এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ‘ইনকিলাব’ ও ‘আজাদি’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে তাঁর এই কঠোর অবস্থান তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গতিপথকে একটি নতুন তর্কের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। ভাষার মাসে স্বকীয়তা রক্ষার এই ডাক কতটুকু কার্যকর হবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন