দেশের তরুণদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং উদ্যোক্তা হওয়ার অমিত সম্ভাবনাকে দেশের মূলধারার উন্নয়ন এজেন্ডায় যুক্ত করার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে 'জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম' (National Startup and Entrepreneurship Platform)।
বুধবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এই প্ল্যাটফর্মটির শুভ উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান।
"তরুণ, স্টার্টআপ এবং এক প্রতিশ্রুতিশীল বাংলাদেশ শীর্ষক এই জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটির মূল স্লোগান ছিল- ‘স্টার্টআপের মাধ্যমে দেশ গড়ো, বাংলাদেশ প্রথম’, (Build the Nation Through Startups, Bangladesh First)। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
সর্বধর্মের পবিত্র গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে শুরু
আজকের এই ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানটি শুরু হয় একটি সর্বজনীন ও উৎসবমুখর পরিবেশে। সভার শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত করা হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে পবিত্র গীতা, ত্রিপিটক এবং বাইবেল থেকে পাঠ করা হয়। সকল ধর্মের ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের এই সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের ভাবগাম্ভীর্য বৃদ্ধি করার পাশাপাশি দেশের আবহমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রযাত্রার এক অনন্য বার্তা বহন করে।
উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানোর মেলবন্ধন
এই বিশেষ আয়োজনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল তরুণ সমাজের উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা, সৃজনশীল প্রতিভা এবং নতুন উদ্যোগ গ্রহণের প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা। আইসিটি বিভাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যৌথ প্রয়াস তরুণদের অ্যাকাডেমিক জ্ঞান ও বাস্তবমুখী স্টার্টআপ সংস্কৃতির মধ্যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সেতু বন্ধন তৈরি করেছে। দেশের নীতি-নির্ধারক ও শিক্ষাবিদদের উপস্থিতিতে এই আয়োজনটি তরুণদের মাঝে নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঁঞা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক এবং অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা কমিটির সম্মানিত সদস্য ড. মো. মোরশেদ হাসান খান। পুরো অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ.বি.এম. ওবায়দুল ইসলামের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে।
সফল উদ্যোক্তাদের বাস্তব সংগ্রামের গল্প
অনুষ্ঠানের শুরুর দিকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বর্তমান চিত্র এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যবহুল ও আকর্ষণীয় তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টারি) প্রদর্শন করা হয়।
এরপর গল্প নয়, বাস্তব, (Not a Story, but Reality) শীর্ষক একটি অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই সেশনে দেশের কয়েকজন সফল স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা অংশ নেন এবং তাদের সফলতার পেছনে থাকা কঠোর পরিশ্রম, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন। কীভাবে একটি সাধারণ আইডিয়াকে কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একটি সফল ব্যবসায়িক মডেলে রূপান্তর করা যায়, তা শুনে উপস্থিত তরুণরা দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হন।
শিক্ষার্থীদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর উন্মুক্ত সংলাপ
অনুষ্ঠানের অন্যতম মূল আকর্ষণ ছিল শিক্ষার্থীদের সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি ও উন্মুক্ত আলোচনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তরুণ ও শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্টার্টআপ গড়ার ক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন প্রশ্ন, প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে তাদের কথা শোনেন এবং তরুণদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।
এই সেশনটি প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার তরুণদের মতামতকে কতটা গুরুত্ব দেয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে তাদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে কতটা আন্তরিক।
প্রধানমন্ত্রীকে সম্মাননা স্মারক প্রদান
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সম্ভাবনাময় এবং কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্বাচিত ৬ জন সফল তরুণের হাতে অনুদানের চেক তুলে দেন। এই আর্থিক অনুদান উদ্যোক্তাদের তাদের ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এরপর, সরকারের পক্ষ থেকে দেশের স্টার্টআপ সংস্কৃতি বিকাশে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে একটি সম্মাননা স্মারক (commemorative crest) প্রদান করা হয়।
কী থাকছে এই নতুন স্টার্টআপ প্ল্যাটফর্মে?
আজকের অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় যে, নবনির্মিত 'জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম' মূলত দেশের নতুন ও উদীয়মান উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল লঞ্চপ্যাড হিসেবে কাজ করবে। একটি মাত্র সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের (Single Integrated Platform) মাধ্যমে দেশের যেকোনো
প্রান্তের উদ্যোক্তারা নিম্নলিখিত সুযোগ-সুবিধাসমূহ খুব সহজেই পাবেন:
- সরকারি সহায়তা কর্মসূচি: সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং প্রণোদনার সহজ প্রাপ্যতা।
- প্রশিক্ষণ ও মেন্টরিং: দেশ ও বিদেশের অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা।
- বিনিয়োগের সুযোগ: দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের (Investors) সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম
- নেটওয়ার্কিং সুবিধা: অন্যান্য উদ্যোক্তা, অংশীদার এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সাথে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ার সুযোগ।
- প্রয়োজনীয় সেবা: ব্যবসা পরিচালনার জন্য লাইসেন্সিং, আইনি সহায়তা এবং কারিগরি সুযোগ-সুবিধা।
নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন
বর্তমান সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তরুণ ও নারীদের স্বাবলম্বী করা। সরকার মনে করে, তরুণ সমাজ এবং নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে, স্টার্টআপ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারের মূল অঙ্গীকার অনুযায়ী- দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তরান্বিত করা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং বাংলাদেশকে একটি উন্নত প্রযুক্তিগত রূপান্তরের (Technological Transformation) দিকে নিয়ে যাওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য।
৫০০ কোটি টাকার 'স্টার্টআপ তহবিল' গঠন
তরুণদের উদ্ভাবনী ধারণাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য বর্তমান সরকার ইতিমধ্যেই বড় ধরনের আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অনুষ্ঠানে জানানো হয় যে, সম্ভাবনাময় এবং নতুন নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলোকে অর্থায়ন ও গতিশীল করতে সরকার ইতিমধ্যে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশাল 'স্টার্টআপ তহবিল' (Startup Fund) গঠন করেছে।
এই তহবিল থেকে অত্যন্ত সহজ শর্তে নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করা হবে, যাতে করে পুঁজির অভাবে কোনো ভালো আইডিয়া বা উদ্ভাবন যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট না হয়ে যায়।
জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা বিকাশে নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান।
‘স্টার্টআপের মাধ্যমে দেশ গড়ো, বাংলাদেশ প্রথম’ স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত এ উদ্যোগে উদ্যোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে ‘গল্প নয়, বাস্তব’ শীর্ষক বিশেষ সেশনের আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি দেশের সম্ভাবনাময় স্টার্টআপগুলোর বিকাশে ৫০০ কোটি টাকার সরকারি স্টার্টআপ তহবিলের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ.বি.এম. ওবায়দুল ইসলাম তাঁর সমাপনী বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ঐতিহাসিক আয়োজনটি সম্পন্ন করার জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আজকের এই প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মেধা পাচার রোধ হবে এবং তরুণরা দেশেই বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
আজকের এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। তরুণদের হাত ধরে এবং সরকারের ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনার মাধ্যমে আগামী দিনে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে একটি প্রথম সারির 'স্টার্টআপ হাব' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে- এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন