মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে একটি দক্ষ ও আধুনিক জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি)। কমিশনের দাবি, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমের নেতৃত্বে কমিশনের কার্যক্রমে নানা পরিবর্তন আনা হয়েছে। কমিশনের সাবেক সচিব ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়ার প্রশাসনিক সহযোগিতায় নিয়োগ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংবিধানের ১৩৭ থেকে ১৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরিচালিত বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন ১৯৭২ সালের ৮ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিবছর ৮ এপ্রিল ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন দিবস’ পালিত হয়। সংবিধান অনুযায়ী চেয়ারম্যান ও নির্ধারিত সংখ্যক সদস্যের সমন্বয়ে পরিচালিত এই স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে আসছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিসিএস পরীক্ষা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা অভিযোগ উঠেছিল। বর্তমান কমিশন সেই আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠাকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে। চেয়ারম্যান ড. মোবাশ্বের মোনেমের ভাষ্য, প্রতিটি পরীক্ষা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার আওতায় এনে বিতর্কমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই কমিশনের লক্ষ্য।
এ লক্ষ্যে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণে আধুনিক ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং বহুস্তরীয় সাংকেতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উত্তরপত্র মূল্যায়নে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, মূল্যায়নকারীদের জন্য কঠোর গোপনীয়তা নিশ্চিত করা এবং মৌখিক পরীক্ষায় দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বোর্ড গঠনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিসিএস পরীক্ষার সময়সীমা নিয়ে প্রার্থীদের অভিযোগ থাকলেও বর্তমান কমিশন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে এক বছরের মধ্যে ৫০তম বিসিএস সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক ও লিখিত পরীক্ষা শেষ করে লিখিত ফলও প্রকাশ করা হয়েছে। এখন মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্নের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নিয়োগ সুপারিশ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া নন-ক্যাডার নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন, বিভাগীয় পরীক্ষা ও জ্যেষ্ঠ স্কেল পরীক্ষা সময়মতো আয়োজন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসংক্রান্ত কার্যক্রমেও গতি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রার্থীদের সুবিধার্থে বিপিএসসি তাদের অনলাইন সেবাও সম্প্রসারণ করেছে। বর্তমানে প্রাক-চাকরি বৃত্তান্ত যাচাই ফরম, ছাড়পত্র, বিপিএসসি ফরম-২ এবং ফরম-৩সহ বিভিন্ন সেবা অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। আবেদন, তথ্য যাচাই ও দাপ্তরিক কার্যক্রম সহজ করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আরও কার্যকর করা হয়েছে।
কমিশনের দায়িত্ব শুধু নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণেই সীমাবদ্ধ নয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪০ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক পরামর্শক হিসেবেও বিপিএসসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদের যোগ্যতা নির্ধারণ, পদোন্নতি ও বদলির নীতিমালা, শৃঙ্খলামূলক বিষয় এবং পেনশনসংক্রান্ত বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে থাকে কমিশন।
এদিকে তথ্য অধিকার আইন এবং জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল ২০২৩-২৪ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে কমিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে জনসাধারণের আস্থা আরও বাড়বে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে সরকারি চাকরিতে বিপুলসংখ্যক তরুণ অংশগ্রহণ করায় বিপিএসসির ওপর দায়িত্ব ও প্রত্যাশা দুটিই বেড়েছে। এ বাস্তবতায় কমিশন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সব ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণের কথা জানিয়েছে।
কমিশনের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় বিপিএসসি ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এম জি
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন