বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে ১৯ বছরের স্প্যানিশ বিস্ময় লামিন ইয়ামাল

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে ১৯ বছরের স্প্যানিশ বিস্ময় লামিন ইয়ামাল

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে পা রেখেছে স্পেন। আর এই জয়ের নেপথ্যে যিনি সবচেয়ে বড় উপহারটি পেয়েছেন, তিনি আর কেউ নন- স্প্যানিশ ফুটবলের নতুন বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল। 

ঘটনাচক্রে, ফ্রান্সের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ সেমিফাইনাল ম্যাচের ঠিক আগের দিনই ছিল এই ফরোয়ার্ডের ১৯তম জন্মদিন। ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে গলায় চকচকে চেইন পরে হাজির হওয়া ইয়ামালকে যখন সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, জন্মদিনের সবচেয়ে সেরা উপহার কী হতে পারে? 

ইয়ামাল হাসিমুখে উত্তর দিয়েছিলেন, এখনও তেমন কোনো উপহার পাইনি। তবে মঙ্গলবারের ম্যাচে জয় এবং ফাইনাল খেলতে নিউ ইয়র্ক যাওয়ার টিকিটটাই হবে আমার জন্য সেরা উপহার।

স্পেনের হয়ে লামিনে ইয়ামাল দ্বিতীয়বারের মতো কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলতে যাচ্ছেন। ফাইল ছবি

টেক্সাসের আর্লিংটনের প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ফরাসি রক্ষণভাগকে নাচিয়ে, নিখুঁত ফুটবল প্রদর্শনীতে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে নিজের জন্মদিনের সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছেন ইয়ামাল। ইউরো ২০২৪-এর পর এবার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন এই তরুণ তুর্কি। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারের ব্যক্তিগত জীবন, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক সংহতি এবং ফুটবলীয় উত্থানের আদ্যোপান্ত নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন।

বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ও পারিবারিক শিকড়

লামিন ইয়ামালের জন্ম স্পেনের বার্সেলোনার এসপ্লুগুয়েস দে ইয়োব্রেগাত পৌরসভায় হলেও, তার ধমনীতে বইছে দুটি ভিন্ন দেশের রক্ত। তার বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোর নাগরিক এবং মা শিলা এবানা বিষুবীয় গিনির (Equatorial Guinea) বাসিন্দা।

তার অফিশিয়াল পুরো নাম 'লামিন ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। তবে স্পেন জাতীয় দল কিংবা তার ক্লাব বার্সেলোনার হয়ে খেলার সময় তিনি কেবল তার প্রথম দুটি নাম- ‘লামিন ইয়ামাল’ ব্যবহার করেন। স্প্যানিশ ফুটবল সংস্কৃতিতে খেলোয়াড়দের কেবল প্রথম নাম ব্যবহার করার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, যেমনটা আমরা ইয়ামালের বর্তমান সতীর্থ পেদ্রি (Pedri) কিংবা স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তি জাভি (Xavi) ও ইনিয়েস্তার (Iniesta) ক্ষেত্রেও দেখেছি।

নামের পেছনের গল্প এবং ধর্মীয় বিশ্বাস

পশ্চিম আফ্রিকান সংস্কৃতি এবং আরবি ভাষার সাথে গভীর সংযোগ রয়েছে ‘লামিন’ নামটির। আরবি ভাষায় এর অর্থ হলো ‘বিশ্বস্ত’ বা ‘আস্থাশীল’। অন্যদিকে ‘ইয়ামাল’ শব্দটি মূলত বহুল প্রচলিত আরবি নাম ‘জামাল’-এর একটি রূপ, যার অর্থ ‘সৌন্দর্য’, ‘অনিন্দ্য রূপ’ বা ‘কমনীয়তা’।

নামের এই আরবি ও ইসলামিক সংযোগের কারণ হলো—লামিন ইয়ামাল একজন অনুশীলনকারী ও একনিষ্ঠ মুসলিম। মাঠের ভেতরেও তার এই ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতিফলন প্রায়শই দেখা যায়। জাতীয় দল কিংবা ক্লাবের হয়ে গোল করার পর তাকে মাঠে হাঁটু গেড়ে সিজদা (ইসলামিক প্রার্থনার অঙ্গ) দিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে দেখা যায়, যা বিশ্বজুড়ে মুসলিম ফুটবল ভক্তদের মাঝে তাকে আলাদা করে তুলেছে।

ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি

ফুটবল মাঠের বাইরেও বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কুড়িয়েছেন ইয়ামাল তার মানবিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি তার সংহতি প্রকাশের বিষয়টি বেশ আলোচিত। চলতি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বার্সেলোনার ট্রফি প্যারেডের সময় একটি ছাদখোলা বাসের ভেতর থেকে তাকে ফিলিস্তিনের জাতীয় পতাকা ওড়াতে দেখা যায়, যা উপস্থিত হাজার হাজার ফুটবল সমর্থককে উদ্বেলিত করেছিল।

লা মাসিয়া থেকে বার্সেলোনার রাজপুত্র, এক নক্ষত্রের উত্থান

বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি ‘লা মাসিয়া’ (La Masia)-র অন্যতম সেরা আবিষ্কার লামিন ইয়ামাল। মাত্র ২০২৩-২৪ মৌসুমে তিনি বার্সেলোনার মূল দলে ডাক পান। তার ক্যারিয়ারের অগ্রগতির গ্রাফ এতটাই দ্রুতগতির যে, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তিনি বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষস্তরে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন।

মূল দলে যোগ দেওয়ার ঠিক পরের মৌসুমেই (২০২৪-২৫) বার্সেলোনার ঐতিহাসিক ঘরোয়া ট্রেবল (Treble) জয়ে তিনি বিশাল ভূমিকা পালন করেন। সেই মৌসুমে বার্সেলোনা লা লিগা, কোপা দেল রে এবং সুপারকোপা দে এস্পানা (স্প্যানিশ সুপার কাপ) জয় করেছিল।

মাঠে ইয়ামালের গতি, অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং দক্ষতা এবং দূরদর্শী পাসিংয়ের স্টাইল ফুটবল বিশ্বের বোদ্ধাদের বাধ্য করেছে তার সাথে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসির তুলনা করতে। শৈশবে মেসিকেই নিজের আদর্শ মানতেন ইয়ামাল। পাশাপাশি ব্রাজিলের অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড নেইমারের খেলার ধরণও তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন।

ইউরো ২০২৪, বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশের টুর্নামেন্ট

দুই বছর আগে, ২০২৪ সালে জার্মানির মাটিতে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে (Euro 2024) স্পেনের শিরোপা জয়ের প্রধান রূপকার ছিলেন লামিন ইয়ামাল। টুর্নামেন্টের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় এবং সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড গড়ে তিনি বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দেন। বয়সের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্বতা দেখিয়ে তিনি সেই আসরে সর্বোচ্চ ৪টি অ্যাসিস্ট (গোল করানো) এবং সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে একটি চোখ ধাঁধানো দূরপাল্লার গোল করেছিলেন।

তার এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে উয়েফার টেকনিক্যাল কমিটি তাকে টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড় (Young Player of the Tournament) হিসেবে নির্বাচিত করে। প্রথম কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নেমেই তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ‘ওয়ান্ডারকিড’ তকমাটি তার জন্য কতটা সার্থক।

চোট কাটিয়ে অপ্রতিরোধ্য যাত্রা

চলমান ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে আসার ঠিক আগে একটি চোটের কারণে ইয়ামালের পারফরম্যান্সে কিছুটা ঘাটতি দেখা গিয়েছিল। আসরের গ্রুপ পর্বে নিজের চেনা ছন্দ খুঁজে পেতে বেশ লড়াই করতে হয়েছে এই ১৯ বছর বয়সী তরুণকে।

চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তিনি মাত্র একটি গোল করলেও স্পেনের ফাইনালের যাত্রায় তার অবদান অনস্বীকার্য। স্পেনের আক্রমণভাগের মূল চালিকাশক্তি বা ‘অ্যাডভান্টেজ ক্রিয়েটর’ হিসেবে কাজ করছেন তিনি। 

সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করা কিংবা বক্সে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখার কাজটি তিনি নিখুঁতভাবে করছেন। সবচেয়ে বড় কথা, ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে স্পেনের পক্ষে সমতা ফেরানোর পেনাল্টিটি আদায় করেছিলেন এই ইয়ামালই।

নকআউট পর্বে স্পেনের হয়ে পর্তুগাল (রাউন্ড অব ১৬) এবং ফ্রান্সকে (সেমিফাইনাল) বিদায় করার পেছনে ইয়ামালের অবদান ছিল চোখে পড়ার মতো। যার ফলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং কিলিয়ান এমবাপের মতো বিশ্বসেরা তারকাদের বিদায় করে ফাইনালের মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে স্পেন।

ইয়ামাল এবং মেসির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা

ফাইনালের মঞ্চে ইয়ামাল ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে। ফুটবলের ইতিহাসে পেলে এবং জুসেপ্পে বার্গোমির পর ইয়ামাল হতে যাচ্ছেন বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ ও ইউরোর ডাবল শিরোপা জয়ের এক বিরল কীর্তি গড়ার সুযোগ রয়েছে তার সামনে।

পরিসংখ্যানের দিক থেকে ইয়ামাল স্পেনের জন্য এক পরম সৌভাগ্যের প্রতীক। তিনি যখনই স্পেনের মূল একাদশে থেকে ম্যাচ শুরু করেছেন, স্পেন কখনোই হারেনি। ইউরো এবং বিশ্বকাপ মিলিয়ে এ পর্যন্ত তিনি ১২টি ম্যাচে শুরুর একাদশে (Starting XI) ছিলেন এবং স্পেনের জয়ের হার ১০০ শতাংশ, যা ইউরোপের অন্য কোনো ফুটবলারের নেই।

ফাইনালের মঞ্চে ইয়ামালের প্রতিপক্ষ কে হবে, তা নির্ধারণ করবে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার দ্বিতীয় সেমিফাইনাল। যদি আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠে, তবে ফুটবল বিশ্ব দেখতে পাবে এক চরম আবেগঘন মুহূর্ত—যেখানে ১৯ বছরের ইয়ামাল মাঠে মুখোমুখি হবেন তার শৈশবের নায়ক ও ফুটবল ঈশ্বর লিওনেল মেসির।

ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য অর্জনসমূহ (এক নজরে): 

  • লা লিগা চ্যাম্পিয়ন (বার্সেলোনা)২০২২-২৩, ২০২৪-২৫, ২০২৫-২৬
  • কোপা দেল রে জয়ী (বার্সেলোনা), ২০২৪-২৫
  • সুপারকোপা দে এস্পানা (বার্সেলোনা) ২০২৫, ২০২৬
  • উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়ন (স্পেন) ২০২৪
  • উয়েফা নেশনস লিগ রানার্স-আপ (স্পেন), ২০২৪-২৫
  • ব্যালন ডি’অর রানার্স-আপ, ২০২৫

১৯ বছর বয়সেই ফুটবল বিশ্বের প্রায় সমস্ত বড় শিরোপা ও ব্যক্তিগত অর্জনের ঝুলিতে টান দেওয়া লামিন ইয়ামাল এখন ফুটবল ইতিহাসের অমরত্ব ছোঁয়ার ঠিক এক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে। নিউ ইয়র্কের ফাইনালের মঞ্চে স্পেনের এই তরুণ মুসলিম প্রডিজি কি পারবেন বিশ্বজয়ের শেষ হাসি হাসতে? উত্তর মিলবে ফাইনালের মহারণেই।

এএন