মেসি কি আসলেই কখনো থামবেন? ইংলিশ রক্ষণ ভেঙে ফাইনালে আর্জেন্টিনা

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৪:১২ পিএম
মেসি কি আসলেই কখনো থামবেন? ইংলিশ রক্ষণ ভেঙে ফাইনালে আর্জেন্টিনা
লিওনেল মেসি ১২৫টি গোল করে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে অনেকটাই এগিয়ে আছেন।

খেলাধুলা জগতের একটি চিরন্তন নিয়ম হলো- সময়ের সাথে সাথে সবার গতি কমে, একসময়ের অপরাজেয় তারকাদেরও বিদায় নিতে হয়। কিন্তু লিওনেল মেসির ক্ষেত্রে কি এই নিয়ম খাটে? চলতি টুর্নামেন্ট জুড়ে তিনি যা করছেন, তা দেখে ফুটবল বিশ্ব আবারও নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। 

প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বোকা বানানো, নিখুঁত পাসে বল ডি-বক্সে পাঠানো আর গোল করার যে ধারাবাহিকতা তিনি বজায় রেখেছেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের পর ফুটবল পণ্ডিতদের মুখে এখন একটাই কথা- ইংল্যান্ড মেসি এবং আর্জেন্টিনাকে মাঠে ‘প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সম্মান’ দিয়ে ফেলেছিল, যার চড়া মূল্য তাদের দিতে হয়েছে।

অথবা, হয়তো মেসির খেলাই এমন যে তাকে সম্মান না দিয়ে কোনো উপায় থাকে না। অথচ একটু পেছনে ফিরে তাকালে মনে হবে, এই জাদুকরী অধ্যায়টা হয়তো অনেক আগেই শেষ হয়ে যেতে পারত।

২০১৬ সালের সেই আবেগঘন অবসর

আজ যখন আমরা মেসিকে একের পর এক ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে দেখি, তখন সহজেই ভুলে যাই যে ২০১৬ সালে এই মানুষটিই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৯ বছর। বার্সেলোনার হয়ে ক্লাব ফুটবলে সম্ভাব্য সব শিরোপা জিতলেও, আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে তার ভাগ্য ছিল চরম নির্মম।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হার, এরপর টানা তিনটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়- মেসিকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসরের ফাইনালে চিলির কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে যাওয়ার পর তিনি ঘোষণা করেন, "আর্জেন্টিনা দলের হয়ে আমার যাত্রা শেষ।

কিন্তু ফুটবল বিধাতা হয়তো মেসির কপালে অন্য কিছু লিখে রেখেছিলেন। কোটি ভক্তের আকুতি আর নিজের ভেতরের তাড়নায় তিনি অবসর ভেঙে ফিরে আসেন। আর সেই ফিরে আসাই ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর পুনরুত্থানের গল্প তৈরি করে। অবসর ভেঙে ফেরার পর তিনি আর্জেন্টিনাকে শুধু একটি নয়, দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপা এনে দিয়েছেন।

কাতার ২০২২, বৃত্ত পূরণের মহাকাব্য

২০২২ সালে যখন পিএসজির (PSG) হয়ে খেলা মেসি কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে অধরা বিশ্বকাপ ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরলেন, তখন মনে হয়েছিল তার ক্যারিয়ারের শেষ ধাঁধাঁটি অবশেষে মিলে গেছে। ফুটবল ইতিহাসের 'সর্বকালের সেরা' (GOAT) বিতর্কের অবসান ঘটাতে এই একটি ট্রফিরই কমতি ছিল। পেলে এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনার পাশে বসার জন্য যে মুকুটের প্রয়োজন ছিল, মেসি সেটি পরম মমতায় নিজের মাথায় পরে নেন।

বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে মেসি নিজেই বলেছিলেন, বিশ্বকাপে আমার যাত্রা একটি ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে শেষ করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। শেষ ম্যাচটি ফাইনালে খেলা সত্যিই খুব তৃপ্তিদায়ক। বর্তমান বিশ্বকাপ থেকে পরবর্তী বিশ্বকাপের মাঝে অনেক বছরের ব্যবধান। আমার মনে হয় না আমি তত দিন খেলা চালিয়ে যেতে পারব। এভাবে শেষ করতে পারাটা দুর্দান্ত।

মেসির এই বক্তব্যের পর সবাই ধরে নিয়েছিলেন, ফুটবলকে দেওয়ার মতো আর কিছুই বাকি নেই তার। তিনি ফুটবলকে পূর্ণতা দিয়েছেন, এবার তার বিশ্রামের পালা।

ইন্টার মায়ামি অধ্যায় এবং নতুন রূপান্তর

২০২৩ সালে ইউরোপের শীর্ষ ফুটবল ছেড়ে মেসি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের (MLS) ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিলেন, তখন ফুটবল বিশ্বের ধারণা ছিল এবার তিনি সত্যিই ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে চলে এসেছেন।

আমেরিকার লিগে খেলা মানেই ধরে নেওয়া হয় অবসরের আগের একটু আয়েশি সময় কাটানো। এমনকি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও যখন তাকে দেখা গেল, তখনও নিশ্চিত ছিল না যে তিনি এই গ্রীষ্মের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামবেন কিনা।

কিন্তু মেসি সব অনুমানকে ভুল প্রমাণ করে আবারও মাঠে নেমেছেন এবং যথারীতি অপরাজিত ও অপ্রতিরোধ্য রূপ দেখিয়েছেন। তবে এই বয়সে এসে তার খেলার ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে। তিনি এখন আর সেই তরুণ মেসি নন, যিনি মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বল পায়ে দৌড়ে বেড়াতেন। স্প্যানিশ সাংবাদিক এবং মেসির জীবনীকার গিলেম বালাগ এর মতে, মেসি তার ক্যারিয়ারে কৌশলগতভাবে নিজেকে অন্তত পাঁচবার নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।

চলতি টুর্নামেন্টের একটি চমকপ্রদ পরিসংখ্যান হলো, ম্যাচের পুরো সময়ে মেসি যতটা দূরত্ব অতিক্রম করেছেন, তার ৪৭ শতাংশ দূরত্বই তিনি পার করেছেন হেঁটে! টুর্নামেন্টের অন্য যেকোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের চেয়ে এটি সর্বোচ্চ হাঁটার রেকর্ড। কিন্তু এই হেঁটে বেড়ানোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার আসল জাদু। তিনি মাঠে অলস হেঁটে বেড়ান না, বরং হাঁটার ছলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের ফাঁকফোকরগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। আর যখনই সুযোগ আসে, চিতার গতিতে বা জাদুকরী পাসে প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করে দেন।

রেকর্ডের পাতায় নতুন ইতিহাস 

বর্তমানে ইন্টার মায়ামি এবং আর্জেন্টিনার হয়ে টানা ১৩টি ম্যাচে গোল অথবা অ্যাসিস্ট করার অনন্য এক কীর্তি গড়েছেন মেসি। আগামী রবিবার স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে যদি তিনি কোনো গোলের পেছনে অবদান রাখতে পারেন (গোল বা অ্যাসিস্ট), তবে ২০১১ সালে গড়া তার ক্যারিয়ারের সেরা টানা ১৪ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্টের রেকর্ডটি ছুঁয়ে ফেলবেন।

একই সাথে, ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর পর ফুটবল ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার এক অনন্য মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।

এখন ফুটবল প্রেমীদের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এটাই কি তবে মেসির শেষ বড় টুর্নামেন্ট? ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে যখন খেলা হবে, তখন মেসির বয়স হবে ৪৩ বছর। সাধারণ যুক্তিতে সেই বয়সে ফুটবল খেলা অসম্ভব। কিন্তু লিওনেল মেসির ক্ষেত্রে সাধারণ যুক্তি বা সমীকরণ খাটানো বোকামি।

আটবারের ব্যালন ডি'অর জয়ী এই মহাতারকাকে নিয়ে কোনো আগাম অনুমান বা ভবিষ্যৎবাণী না করাই শ্রেয়। তিনি যতদিন মাঠে আছেন, ফুটবল বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবেন- সে তিনি হেঁটেই খেলুন আর দৌড়েই খেলুন।

এএন