Amar Sangbad
ঢাকা সোমবার, ২০ মে, ২০২৪,

বাড়ছে দর্শনার্থী : স্মার্ট জাদুঘরের উদ্যোগ

মো. নাঈমুল হক

মার্চ ৭, ২০২৪, ০৫:১২ পিএম


বাড়ছে দর্শনার্থী : স্মার্ট জাদুঘরের উদ্যোগ
  • দেশি দর্শনার্থী বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ
  • উদ্বোধনের অপেক্ষায় ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর
  • বিদেশি বেড়েছে চারগুণের বেশি
  • জাতীয় ইনভেন্টরি প্রকল্পের কাজে সাফল্য

দুই বছরের মধ্যে জাদুঘরকে স্মার্ট করতে পারব 
—মো. কামারুজ্জামান
মহাপরিচালক, জাতীয় জাদুঘর

জাতীয় জাদুঘর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জাদুঘর ও সংগ্রহশালা। এটি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃ-তাত্ত্বিক, শিল্পকলা ও প্রাকৃতিক ইতিহাস সম্পর্কিত নিদর্শনাদি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও গবেষণার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় লাখের মতো নিদর্শনাদি রয়েছে। প্রতিনিয়ত দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী ভিড় করে জাদুঘরে। গত এক বছরে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বিদেশি পর্যটকের ক্ষেত্রে এটি বেড়েছে চারগুণ। জাদুঘরের ধারণা জনসমাজে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর। যেকোনো সময় এটি উদ্বোধন করা হবে। জাদুঘরকে আধুনিক ও স্মার্ট করার জন্য নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশি সংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় তুলে ধরতে গঠিত হয়েছে জাতীয় ইনভেন্টরি প্রকল্প। এ প্রকল্পে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে জাতীয় জাদুঘর। 

জানা গেছে, ১৯১৩ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার দেশের প্রথম জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে। সত্তর বছর পর ১৯৮৩ সালে এটি জাতীয় জাদুঘরের মর্যাদা লাভ করে। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ গত বছর একুশে পদক পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংগৃহীত নিদর্শনের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। প্রতিটি নিদর্শনের একটি একসেশন নম্বর আছে। নিদর্শনের নাম, সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও ফটো নিয়ে কম্পিউটার ডেটাবেইস প্রণয়ন করা হয়েছে। সাত হাজার ৫০০ নিদর্শনের বর্ণনামূলক ক্যাটালগ প্রণয়ন ও প্রকাশ করা হয়েছে। নিদর্শনগুলো কেউ দান করে, আবার কেউ বিক্রি করে। জাদুঘরের মূল আকর্ষণ গ্যালারি। সেই গ্যালারির সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হয়েছে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। নতুন একটি গ্যালারিসহ বর্তমানে ৪৬টি গ্যালারি রয়েছে। সম্প্রতি কামরুল হাসান গ্যালারি উদ্বোধন করা হয়েছে। আরো গ্যালারির সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।  

উদ্বোধনের অপেক্ষায় ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর : ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। জাদুঘরে না এসেও সাধারণ মানুষ জাদুঘরের নিদর্শনাদি দেখতে পাবেন। মূলত মানুষের জাদুঘর পৌঁছানোর জন্য এ উদ্যোগ। এটির  কার্যক্রম শেষ হয়েছে। শিগগিরই এটি উদ্বোধন করা হবে।

এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ দর্শনার্থী বেড়েছে : বর্তমানে জাদুঘরে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। জাদুঘরে দুই উপায়ে ভ্রমণ করে দর্শনার্থীরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবেদন সাপেক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ফ্রিতে ভ্রমণ করে। প্রতিদিন এমন পাঁচ থেকে ১০টি প্রতিষ্ঠান ভ্রমণে আসে। এমন দর্শনার্থীদের সংখ্যা দৈনিক এক থেকে দেড় হাজারের মতো। এ দর্শনার্থী ছাড়াও নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ দিয়ে ভ্রমণকারী দর্শনার্থীও আসেন। জাদুঘরের বার্ষিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত এক বছরে এমন দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে দুই লাখেরও বেশি। এর মধ্যে বিদেশি দর্শনার্থী বেড়েছে চারগুণের বেশি। ২০২১-২২ সালের জাদুঘরের দর্শনার্থী ছিল দুই লাখ ২৯ হাজার ৯৮ জন। এ সময়ে বিদেশি দর্শনার্থী ছিলেন ৩৩৮ জন। এক বছরের ব্যবধানে সেটি বেড়ে হয়েছে চার লাখ ৩৪ হাজার ২৬ জন। বিদেশি দর্শনার্থী ভ্রমণ করেছে এক হাজার ৬৪৪ জন। অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণের মতো দর্শনার্থী বেড়েছে। বিদেশি বেড়েছে চারগুণেও বেশি। জাদুঘরের দর্শনার্থী বাড়ানোর জন্য প্যান প্যাসিফিক হোটেলের দর্শনার্থীদের সিটি ট্যুরের অংশ হিসেবে জাতীয় জাদুঘরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের দর্শনার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে। সেটি করতে পারলে বিদেশি দর্শনার্থীর সংখ্যা আরো বাড়বে। 

জাদুঘরকে স্মার্ট করার প্রকল্প : জাতীয় জাদুঘরকে স্মার্ট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কাজ চলছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। জাদুঘর স্মার্ট হলে এর ডিভাইসগুলো স্মার্ট হবে। বিদেশে বসে জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ থাকবে। প্রত্যেকটি নিদর্শনের ব্যাকগ্রাইন্ড সেখানে থাকবে। সেগুলোর সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। সিকিউরিটি সিস্টেম অটোমেশন হবে। ভার্চুয়াল গ্যালারি ও অডিও গাইড থাকবে। গবেষকদের গবেষণার সুবিধার্থে তথ্য ও প্রকাশনার ই-বুক প্ল্যাটফর্ম থাকবে। 

জাদুঘরে শিশুদের জন্য তৈরি হবে চিলড্রেন লাইব্রেরি। জাপানের অর্থায়ন ও একজন বিশ্বখ্যাত স্থপতির নকশায় চিলড্রেন লাইব্রেরি করা হবে। এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে এর কার্যক্রম শুরু হবে। দেশে তিন থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের জন্য এটি উন্মুক্ত থাকবে। 

জাতীয় ইনভেন্টরি প্রকল্পের কাজে সাফল্য : ২০২৩ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতীয় ইনভেন্টরি প্রকল্প গ্রহণ করে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে জাদুঘর এ দায়িত্ব পায়। দায়িত্বের তিন মাসের মাথায় বাংলাদেশের রিকশা ও রিকশা চিত্রকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত লাভ করায় প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি বছর ইউনেস্কো বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৭-২৩ পর্যন্ত এই সাত বছরে বাংলাদেশের কোনো শিল্প স্বীকৃতি পায়নি। ২০২৩-এর শেষের দিকে জাদুঘর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজের (বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য) দায়িত্ব পায়। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে নিয়ে কাজ করছে। টাঙ্গাইল শাড়িকে সম্প্রতি ভারত নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে দাবি করেছে। এ ব্যাপারে শিগগিরই ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্টেশন হবে। এরপরই টাঙ্গাইল শাড়িকে বিশ্ব ঐতিহ্যর স্বীকৃতির জন্য কাজ করবে জাতীয় জাদুঘর। এ ছাড়া বর্তমানে ১১৪টি পণ্যকে বিশ্ব ঐতিহ্যর স্বীকৃতির জন্য কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। 

প্রদর্শনের সুবিধার্থে ১২তলা ভবন নির্মাণ : স্থান সংকুলানের কারণে জাদুঘরের সব নির্দশন একই সময়ে প্রদর্শন করা যায় না। জাতীয় জাদুঘরের প্রদর্শনের সুবিধার্থে ১২তলা বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি তৈরি হলে স্থান ও নিদর্শন প্রদর্শনের সংকট দূর হবে। জাদুঘর একটি আধুনিক ম্যানেজমেন্টের পর্যায়ে আমরা চলে যাবে। বর্তমানে প্রকল্পটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। 

জাদুঘরের মহাপরিচালক মো. কামারুজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, জাদুঘরকে জনগণের দোড়গোড়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এ ছাড়া জাদুঘরকে স্মার্ট ও আধুনিক করার জন্য নানামুখী উদ্যোগ রয়েছে। আশা করছি, আগামী দুই বছরের মধ্যে সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে পারব। গত বছর আমরা একুশে পদক পেয়েছি। জাদুঘরকে বলা হয় জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা চাই, শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সবাই যেন জাদুঘর ভ্রমণে উদ্বুদ্ধ হন। জাদুঘর ভ্রমণের মাধ্যমে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ভ্রমণের একটি সুযোগ হয়। এক সঙ্গে অনেক নিদর্শন দেখার সুযোগ পাবে তারা। সে জন্য আমি বলব, বেশি বেশি জাদুঘর ভ্রমণ করা প্রয়োজন।’
 

Link copied!