Amar Sangbad
ঢাকা রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪,

বিনিয়োগকারীদের গলার কাঁটা ৫ ব্যাংকের শেয়ার

আনোয়ার হোসাইন সোহেল

আনোয়ার হোসাইন সোহেল

জুন ২৩, ২০২৪, ১২:৩৩ এএম


বিনিয়োগকারীদের গলার কাঁটা ৫ ব্যাংকের শেয়ার

ডিভিডেন্ড না দিলে ব্যবস্থা নেবে বিএসইসি —রেজাউল করীম

বিনিয়োগকারীদের জন্য সুখবর নেই —ইউনিয়ন ব্যাংক সেক্রেটারি

কিছু করার নেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের —মেজবাউল হক

সাবেক এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্টের ব্যাংকের শেয়ার দর তলানিতে

আইপিওর অনুমোদনের টাকা তুলে নিয়েই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে ব্যাংক

গ্যাম্বলাররা তো এলিয়ন না —বিনিয়োগকারী

শেয়ারবাজারেও ছায়া পড়েছে দুর্বল ব্যাংকের। অব্যবস্থাপনা, পরিচালকদের স্বেচ্ছাচারিতা, অডিট দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি জটিলতায় ব্যাংকগুলোর শেয়ার দর ফেসভ্যালুর নিচে নেমে বিনিয়োগকারীদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে কষ্টে কেনা শেয়ারগুলো বিক্রি করতে পারছেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। যারা বিক্রি করছেন তারাও হারাচ্ছেন বড় অঙ্কের পুঁজি। ফেসভ্যালুর নিচে শেয়ার দর থাকা ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে— আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ওয়ান ব্যাংকের নাম। বর্তমানে কোনো কোনো ব্যাংকের শেয়ার দর প্রায় সাত টাকা পর্যন্ত কমেছে।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, পরিচালকদের স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির অভাবে আজ আমরা পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব। দীর্ঘদিন ধরে পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ার দর ফেসভ্যালুর নিচে অবস্থান করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিএসইসি ও ডিএসই তেমন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। গ্যাম্বলারদের ওপর দোষ চাপিয়ে দায় সারছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো! এতে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কারা বাজারে কারসাজি করছে কমিশন তাদের ধরার ব্যাপারে কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তারা তো আর ‘এলিয়ন’ নয় যে তাদের ধরাছোঁয়া যাবে না।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইউনিয়ন ব্যাংক সবশেষ ২০২২ সালে বিনিয়োগকারীদের মাত্র ৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল, এবি ব্যাংক ২০২২ সালে দেয় ২ শতাংশ বোনাস ডিভিডেন্ড, ইসলামী শরীয়াহ্ ভিত্তিক গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ২০২২ সালে ১০ শতাংশ ক্যাশ ও বোনাস ডিভিডেন্ড দিয়েছে, ওয়ান ব্যাংক ২০২০ সালে দেয় ৫ শতাংশ বোনাস ডিভিডেন্ড। তবে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ক্যাশ ও বোনাস ডিভিডেন্ড দেয়ার কোনো তথ্য ডিএসইর ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি। এরপর থেকে ব্যাংকগুলোর শেয়ার দর কমতে থাকে।

পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ব্যাংকগুলো কেন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, এ ব্যাপারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কি কিছুই করার নেই। এ নিয়ে কথা বলতে ডিএসইর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাফিজ মুহম্মদ হাসান বাবুর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

আলোচ্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের ১০ টাকার শেয়ারদর এখন ৬ টাকা ৫০ পয়সা। ব্যাংকটি ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ সালে বিএসইসির ৭৯০তম কমিশন সভায় ইউনিয়ন ব্যাংক প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৪২ কোটি ৮০ লাখ সাধারণ শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ৪২৮ কোটি টাকা তুলে নেয়। দীর্ঘদিন ধরে শেয়ার দর ফেসভ্যালুর নিচে থাকলেও এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের কোনো আশারবাণী শোনাতে পারছেন না বলে জানালেন কোম্পানির সেক্রেটারি আলী হোসেন ভূইয়া। তিনি বলেন, ‘এটা তো ম্যানেজমেন্টের বিষয়, আমি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারব না। তবে সামনে জুন ক্লোজিং আছে, তখন হয়তো কোনো সুসংবাদ বিনিয়োগকারীরা পেলে পেতেও পারেন।’

ফেসভ্যালুর নিচে থাকা আরেক ব্যাংক গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের প্রতিটি ১০ টাকার শেয়ারের দর এখন ৬ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীরা হারিয়েছেন শেয়ার প্রতি ৩ টাকা ৫০ পয়সা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ১৫ জুন ২০২২ সালের চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৪২৫ কোটি টাকা তোলার অনুমোদন দেয় শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২০ সালে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শরীয়াহ্ ভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি ও বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন এই ব্যাংকের অনুমোদন দেন।

১৯৯০ সালে কার্যক্রম শুরু করে দ্বিতীয় প্রজন্মের ওরিয়েন্টাল ব্যাংক বা আজকের আইসিবি ইসলামী ব্যাংক। তবে কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই ওরিয়েন্টাল ব্যাংকে বিভিন্ন অনিয়ম দেখা দেয়। পরবর্তীতে না পাল্টিয়ে ২০০৪ সালে আইসিবি ইসলামী ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। এখন কোম্পানিটির প্রতিটি ১০ টাকার শেয়ার ৩ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার প্রতি হারিয়েছেন ৬ টাকা ৭০ পয়সা। এ ব্যাংকটিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ২৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

ফেসভ্যালুর নিচে রয়েছে দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক এবি ব্যাংকের শেয়ার দরও। ১৯৮১ সালের ৩১ ডিসেম্বর যাত্রা করা দেশের প্রথম এই বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে গঠিত হয়। যা ১৯৮২ সালের ১২ এপ্রিল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে ব্যাংকটির শেয়ার দর ৭ টাকা। কোম্পানিটি ২০২২ সালে বিনিয়োগকারীদের ২ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক আফজালকে একাধিকবার কল করে ও মুঠোফোনে এসএমএস পাঠিয়েও তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এছাড়া কোম্পানির সেক্রেটারিকে কল করা হলে তিনিও কল রিসিভ করেননি। এদিকে ওয়ান ব্যাংকের প্রতিটি ১০ টাকার শেয়ার সবশেষ ৭ টাকায় নেমে এসেছে। কোম্পানি সেক্রেটারি জন সরকারকে একাধিকবার কল দিলেও তিনিও রিসিভ করেননি।

ডিএসইর সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি আহমেদ রশীদ লালী আমার সংবাদকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর পেইডআপ ক্যাপিটাল ৭০০ থেকে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। তাছাড়া তারা (ব্যাংকগুলো) বাংলাদেশ ব্যাংক ও অডিট ফার্মের মাধ্যমে ওয়েল রেগুলেটেড। বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এখানে দুই টাকা গেইন করলেও অনেক টাকা পাবেন বিনিয়োগকারীরা। তবে এখানে ক্যাপিটাল গেইন হতে সময় লাগে।’

শেয়ারের দর ফেসভ্যালুর নিচে থাকা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগকারীদের এখন কি করা উচিত— জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান বলেন, ‘যে কোম্পানিগুলো ভালো ডিভিডেন্ট দেবে বুঝে শুনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সেখানে বিনিয়োগ করাই ভালো হবে। তবে ফেসভ্যালুর নিচে যাদের শেয়ার দর তাদের ব্যাপারে বিএসইসির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’

দীর্ঘদিন ধরে যেসব ব্যাংক কোম্পানির শেয়ার দর ফেসভ্যালুর নিচে তাদের ব্যাপারে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কী ব্যবস্থা নিচ্ছে জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম আমার সংবাদকে বলেন, কোনো ব্যাংকের শেয়ার দর ফেসভ্যালুর নিচে গেলে বিএসইসির কিছুই করার নেই। তবে প্রাইমারি রেগুলেটর হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জবাব দিতে হয় ব্যাংকগুলোকে। তবে দীর্ঘসময় ধরে যদি ব্যাংক ডিভিডেন্ড না দেয়, সেক্ষেত্রে বিএসইসি ব্যাংকগুলোকে কারণে দর্শানোর নোটিশ দেয়। এখন মার্কেট কিছুটা ডাউন আছে, আপার অ্যান্ডে চলে এলে শেয়ার দরও বাড়বে।

পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব আইপিওর মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা তুলে নিয়ে ব্যাংকগুলো কেন এতটা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কী করণীয় আছে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হক এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এখন পর্যন্ত পুঁজিবাজারে দেশের ৪৩টি ব্যাংকের বিনিয়োগ আছে ১৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। সব রকমের সুযোগ থাকার পরও সরকারি তিনটি ব্যাংক সোনালী, জনতা ও অগ্রণী অজ্ঞাত কারণে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত হচ্ছে না।

Link copied!