ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

যুদ্ধ এখন তেলের নজেলে

রুহেল হাশেমী 

রুহেল হাশেমী 

মার্চ ৮, ২০২৬, ১২:০২ এএম

যুদ্ধ এখন তেলের নজেলে

রাজধানী ঢাকার রাজপথে গতকাল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ছবি ফুটে উঠে। একদিকে সরকারের নীতিনির্ধারক ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আশ্বস্তবাণী- ‘তেলের কোনো অভাব নেই, মজুত পর্যাপ্ত’; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা- ‘পাম্পে তালা, মাইকে তেল নেই ঘোষণা’। মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের আঁচ যেন হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের তেলের নজেলে এসে লেগেছে। গতকাল সকাল থেকে ঢাকা শহরের অলিগলি আর প্রধান সড়কগুলোতে যে হাহাকার দেখা গেছে, তা কেবল তেলের সংকট নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন।

পাঠাও চালক তুহিন থেকে শুরু করে হাজারো শ্রমজীবী মানুষের একটিই প্রশ্ন তুলছে- যুদ্ধ কি ইরানে হচ্ছে না কি আমাদের দোরগোড়ায়। শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকেই রাজধানীর চিত্র বদলাতে শুরু করে। বিকেলে যেখানে দীর্ঘ সারি ছিল, গতকাল শনিবার সকালে সেখানে দেখা গেছেসুনসান নীরবতা অথবা ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড। অথচ গতকালই জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত রাজধানীর পাম্পগুলো পরিদর্শন করে দাবি করেছিলেন, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই এবং আগামী সপ্তাহেই নতুন তেলের জাহাজ বন্দরে পৌঁছাবে। কিন্তু মন্ত্রীদের এই অভয়বাণী মাঠ পর্যায়ে কোনো স্বস্তি ফেরাতে পারেনি। বরং পাম্প মালিকদের একাংশের রহস্যময় আচরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্থবিরতা সাধারণ মানুষকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।

তুহিনের গল্প : যখন চাকা থামলে চুলাও থামে

রাজধানীর মগবাজার মোড়ে একটি বন্ধ ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন পাঠাও চালক তুহিন। চোখেমুখে রাজ্যের ক্লান্তি আর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। গতকাল সকাল থেকে মিরপুর, শেওড়াপাড়া কল্যাণপুর আর শ্যামলী এলাকার অন্তত সাতটি পাম্প ঘুরেও এক লিটার অকটেন সংগ্রহ করতে পারেননি তিনি। মতিঝিলের পাম্পেও তেল নাই। তুহিন ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘মন্ত্রীরা বলছেন তেল আছে, কিন্তু পাম্পে এলে বলে তেল নাই। আমাদের মতো মানুষের তো একদিন গাড়ি না চললে ইনকাম বন্ধ। কাল রাত থেকে ঘুরেও তেল পেলাম না। এভাবে চললে আমরা খাব কী? পরিবার চলবে কেমনে? যুদ্ধ হচ্ছে ইরানে, আর শাস্তি পাচ্ছি আমরা। মনে হচ্ছে যুদ্ধটা আমাদের দেশেই হচ্ছে।

তুহিনের এই আর্তনাদ ঢাকার প্রতিটি রাইড শেয়ারিং চালক, গাড়ি চালক এবং ক্ষুদ্র পরিবহন শ্রমিকদের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই মানুষগুলোর কাছে জ্বালানি তেল কেবল একটি তরল পদার্থ নয়, এটি তাঁদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন।

পাম্প কেন বন্ধ, কারসাজি না কি বাস্তব সংকট

রাজধানীর তেজগাঁও, সাতরাস্তা এবং ধানমন্ডি এলাকার বেশ কিছু ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে প্রবেশপথ দড়ি দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন। পাম্প মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে তেলের সরবরাহ কমে গেছে। তবে বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও পাম্প মালিকদের একটি অংশ ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় তেল মজুত করে রাখছে অথবা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।

মগবাজারের একটি পাম্পের ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গতকাল রাতেও তেলের জন্য মানুষ মারামারি করেছে। আমাদের যে পরিমাণ তেল ছিল তা রাতেই শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে ডিপো থেকে গাড়ি আসেনি। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পাম্পগুলো কেবল পরিচিত গ্রাহকদের বা বেশি দামে গোপনে তেল বিক্রি করছে। এই অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর কোনো নজরদারি চোখে পড়েনি।’

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও গুজব

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশে এর প্রভাব এখনই ‘শূন্য মজুত’ পর্যায়ে আসার কথা নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক সংকট’।

১. প্যানিক বায়িং: মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি তেল কিনে মজুত করছে। ২. গুজব: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে’- এমন বার্তায় মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাম্পে ভিড় করছে। ৩. বাজার নিয়ন্ত্রণহীনতা: সরকারের আশ্বাসের সাথে মাঠ পর্যায়ের মিল না থাকায় মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে।

সরকারের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি

বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। যদি দ্রুত তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা না হয় এবং পাম্পগুলোতে তদারকি বাড়ানো না হয়, তবে এর প্রভাব সরাসরি নিত্যপণ্যের বাজারে পড়বে। পরিবহন ধর্মঘট বা ভাড়া বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছাবে।

বিশেষ করে তুহিনের মতো যারা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের কথা মাথায় রেখে সরকারকে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে অনুরোধ করা হচ্ছে—

  • ডিপো থেকে সরবরাহ ত্বরান্বিত করা: জাহাজ আসার অপেক্ষা না করে বর্তমান মজুত থেকে দ্রুত পাম্পগুলোতে তেল পৌঁছানো।
  • ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা: যেসব পাম্প তেল থাকা সত্ত্বেও ‘নেই’ বলছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তি দেয়া।
  • সঠিক তথ্য প্রচার: প্রতিদিন কী পরিমাণ তেল কোন পাম্পে দেয়া হচ্ছে, তা সরকারিভাবে প্রকাশ করা যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত না হয়।

যুদ্ধ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই হোক না কেন, তার মাশুল যেন আমাদের দেশের খেটে খাওয়া মানুষকে দিতে না হয়। সরকারের দুই মন্ত্রী যখন বলছেন ‘অভাব নেই’, তখন পাম্পে তালা ঝুললে সেই বক্তব্যের মর্যাদা থাকে না। মানুষের জীবনযাত্রার চাকা সচল রাখতে জ্বালানি তেলের এই লুকোচুরি বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। তুহিনের মতো হাজারো চালক আজ তাকিয়ে আছেন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দিকে। কারণ, তাদের কাছে গাড়ি না চলা মানে কেবল আয় বন্ধ হওয়া নয়, বরং সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে না পারার ব্যর্থতা।

Link copied!