নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ২৯, ২০২৬, ১২:০৩ এএম
অস্তিত্ব সংকটে রাজধানীর আশেপাশের সব খাল, অবহেলায় পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে। স্বাভাবিক পানি প্রবাহে বাধার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীতে দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা। খাল ভরাটের ফলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণ বাড়ছে।
রাজধানীর খাল পরিষ্কারে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও এর বেহাল দশা দূর হচ্ছে না। আশেপাশের বাসিন্দারা প্রতিটি খালে পলিথিন, পুরোনো সোফা, কার্পেট, চটের বস্তাসহ বাসাবাড়ির সব ধরনের ময়লা প্রতিদিনই ফেলে। ফলে বারবার সংস্কারের পরও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার কারণে খালগুলো ফের ভরাট হচ্ছে। আর সেই সুযোগে অনেক স্থানে খালের জায়গা বেদখল হয়ে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ৪৬টি খালের মধ্যে ২০টিই বিলীন হয়ে গেছে। কাগজে-কলমে ২৬ খালের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও দখল ও দূষণে এগুলোও হারিয়ে যেতে বসেছে। রাজধানীর পানিবদ্ধতা নিরসনে খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করতে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
ওয়াসা থেকে বুঝে নেয়ার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) রাজধানীর পানিবদ্ধতা নিরসনে ১২টি খাল থেকে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে। পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে কিছু কিছু অংশে খননও করা হয়। তবে মাত্র দুই-তিন মাসের ব্যবধানে এসব খাল আগের চেহারায় ফিরে আসে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) চারটি খাল সংস্কার এবং নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে ৮৯৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এ প্রকল্প ২০২৬ সাল পর্যন্ত চলবে।
আর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) এলাকার খালের জন্য ৬৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছে। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হচ্ছে না। ঢাকার খাল ডাস্টবিন বা ময়লার ভাগাড়ই থাকছে। সিটি কর্পোরেশন মাঝে মাঝে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে ফেলে রাখে। এর পর কিছুদিন যেতে না যেতে খালের আশপাশের বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও কলকারখানা থেকে ফেলা বর্জ্য আর প্লাস্টিকে খালগুলো আবারও ভাগাড়ে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার খাল ময়লা-আবর্জনায় ভরাট ও অবৈধ দখলের ফলে বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা যেমন হচ্ছে তেমনি পরিবেশ দূষণও বাড়ছে। ওয়াসার কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নিয়ে দুই সিটি কর্পোরেশন নিজস্ব ফান্ড থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে অনেক খাল পরিষ্কার করে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হচ্ছে না। ঢাকার খালগুলো ময়লার ভাগাড়ই আছে। পরিষ্কারের পর কিছুদিন যেতে না যেতেই সব খাল আবারও ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। একসময় ঢাকার কেরানীগঞ্জে সুপেয় পানির অন্যতম উৎস ছিল শুভাঢ্যা খাল। এতে মাছ শিকার করে চলত অনেকের জীবন। খালে চলত বড় বড় নৌযান যাত্রীবাহী, মালবাহী। এখন খালে চলাচল তো দূরের কথা, পাশ দিয়েও হাঁটা দায়। সাত কিলোমিটার খালটির প্রায় অর্ধেক পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে।
সমপ্রতি বুড়িগঙ্গা নদীর সংযোগস্থল দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চর কালীগঞ্জ, কালীগঞ্জ বাজার জোড়া সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গার্মেন্টসের টুকরো কাপড় ও বাজারের বর্জ্যে ভরাট হয়ে যাচ্ছে খাল। নয়া শুভাঢ্যা, কদমতলী, চরকুতুব, ঝাউবাড়ি, বেগুনবাড়ি, গোলামবাজার ও শুভাঢ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-সংলগ্ন শমসেরপুল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ময়লা-আবর্জনা ও গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলায় খালের অস্তিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে।
রামপুরা খালে অবৈধ দখল তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও দূষণের ফলে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। খালটির মেরাদিয়া বাজার অংশে বিশাল ময়লার ভাগাড় রয়েছে। ওখানে ময়লা ফেলার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) থাকলেও সেটি অনেকদিন ধরে নষ্ট। এ এসটিএসের সামনে খালের পাড়ে বনশ্রী ও দক্ষিণ বনশ্রীর বাসাবাড়ির ময়লা ফেলা হয়। কিছু ময়লা ল্যান্ডফিল্ডে নিলেও অধিকাংশ খালে পড়ে। একই অবস্থা কাটাসুর খাল, রূপনগর খাল, সাংবাদিক কলোনি খাল, উত্তরা দিয়াবাড়ি খাল ও কল্যাণপুর খালের। বিভিন্ন সময় অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং খাল পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও তা আবার পুরোনো রূপে ফিরছে।
রাজধানীর শ্যামপুর বড়ইতলা এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল বলেন অনেকদিন যাবত খালের এই অংশে কোনো সংস্কার করা হয়নি। এতে খালটি পুরো ভরাট হয়ে গেছে এবং এলাকায় মশার উৎপাতও বেড়ে গেছে। শ্যামপুর খালের দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। কাগজে-কলমে এ খালের প্রস্থ কোথাও ১৫ ফুট, কোথাও ৩৫ ফুট। পূর্ব জুরাইনের বড়ইতলা থেকে শুরু হয়ে এ খাল বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সিদ্ধিরগঞ্জের পাগলা খালে গিয়ে মিশেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেই রাজধানীতে পানিবদ্ধতা দেখা দেয়। কারণ, রাজধানীর সারফেস ড্রেনের মুখগুলো প্লাস্টিক ও বর্জ্যে বন্ধ। বৃষ্টির পানি ড্রেনের মুখেই আটকে থাকে। সিটি কর্পোরেশনের উচিত, খালগুলো দখলমুক্ত করে পরিষ্কার করা। পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি করা।