চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ কওমি মাদ্রাসা আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুইনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা শাহ মুহাম্মদ ইয়াহিয়ার জানাজা নামাজ লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।
শনিবার (৩ জুন) বাদে মাগরিব মাদ্রাসা সামনে ডাকবাংলো চত্বরে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের আমীর ও মজলিসে শূরা পরিচালনা কমিটির সদস্য আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর ইমামতিত্বে জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজা নামাজে স্থানীয় সাংসদ ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, আওয়ামীলীগ নেতা আলহাজ্ব ইউনুছ গণি চৌধুরী, মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী অংশ নেন।
এছাড়া দেশের বিভিন্নস্থান থেকে এসে লাখো মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। নামাজ শেষে মাদ্রাসার কবরস্থানে প্রয়াত আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহঃ) এর পাশে আল্লামা শাহ মোহাম্মদ ইয়াহিয়াকে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুকালে হুজুরের বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তার ৩ ছেলে এবং ৪ মেয়ে সন্তান রয়েছে। ছেলেদের মধ্যে সবাই আলেম বলে জানাগেছে। জানাজার পূর্বে মাদ্রাসার শূরা বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে জামেয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আল্লামা হাবিবুল্লাহ কুরাইশি (রহঃ) এর নাতি আল্লামা মুফতী খলীল আহমদ কাসেমীকে মহাপরিচালক হিসেবে মনোনীত করা হয়। জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, বেলা বাড়ার সাথে সাথে শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। দুপুরের দিকে চট্টগ্রাম নগরীর সিএসসিআর প্রাইভেট হাসপাতালের এইচডিইউতে ভর্তি করানো হয়। সেখানে অবস্থার আরো অবনতি হলে পরদিন শুক্রবার রাজধানীর ইউনাইটেড হসপিটালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সকল চেষ্টার অবসান ঘটিয়ে রাত দেড় টার দিকে ইন্তেকাল করেন তিনি। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তার ইন্তেকালের খবরে তাৎক্ষণিকভাবে সারাদেশের উলামায়ে কেরাম, মাদরাসাছাত্র ও তৌহিদী জনতার মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। উল্লেখ্য, গত দু`মাস ধরে আল্লামা শাহ মুহাম্মদ ইয়াহিয়া শরীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। গত ১৬ মে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ব্যাংককে নেওয়া হয়। সেখানে জানা যায় লিভার ক্যান্সারজনিত রোগে আক্রান্ত তিনি। চিকিৎসা শেষে গত ২৫ মে সেখান থেকে তিনি দেশে ফিরেন। আল্লামা শাহ মোহাম্মদ ইয়াহিয়া (রহঃ) ১৯৪৭ সালের ১৫ জুন চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী পৌরসভার আলমপুর গ্রামে কাজি সালেহ আহমদের বাড়ির এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তার পিতা কাজি আব্দুল আজিজ এবং মাতা আঞ্জুমান খাতুন। শিক্ষা জীবনে তিনি ১০ বছর বয়সে হাটহাজারী মাদরাসার ফোরকানিয়া মক্তব বিভাগের শিক্ষক কারী নুরুল হক আলমপুরীর কাছে মাদরাসা নেসাবের প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা অব্যাহত রেখে হাটহাজারী মাদরাসা থেকেই ১৯৭৩ সালে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পর উপজেলার গড়দুয়ারা মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি গড়দুয়ারা মাদরাসায় দীর্ঘ ৯ বছর, মাদার্শা মাদরাসায় তিন বছর, ঈছাপুর ফয়জিয়া তাজবিদুল কুরআন মাদরাসায় ছয় বছর শিক্ষকতা করেন। এরপর তিনি ১৯৯১ সালে দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায় যোগদান করেন।
গত ২০২১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দারুল উলূম মুইনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার মজলিশে শূরা বৈঠকে আল্লামা আব্দুচ্ছালাম চাটগামীকে মাদরাসার মহাপরিচালক পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। শূরা সিদ্ধান্তের এ ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই আব্দুচ্ছালাম চাটগামী ইন্তিকাল করেন। পরে ওই একই মজলিসে শূরার বৈঠকে আল্লামা ইয়াহিয়াকে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সেই থেকে ইন্তিকালের আগ পর্যন্ত তিনি মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তার আগে ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মাদরাসায় অনুষ্ঠিত মজলিসে শূরার বৈঠকে আল্লামা মুহাম্মদ ইয়াহিয়াকে তিন সদস্য বিশিষ্ট মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। মহাপরিচালকের পদে নিযুক্তির আগে তিনি দারুল উলূম হাটহাজারী মাদরাসার মুহাদ্দিস ছিলেন। মুহাদ্দিসের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি মাদরাসার প্রশাসনিক বিভিন্ন দফতরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। তিনি কয়েক যুগ ধরে হাটহাজারী মাদ্রাসার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মুখ্য প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
তিনি আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহঃ) এর ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মাদরাসা পরিচালনায় প্রশাসনিক কোন সমস্যার মুখে পড়লে আল্লামা ইয়াহিয়া তা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। এছাড়াও তিনি কয়েক যুগ ধরে মাদরাসার হিসাব বিভাগ পরিচালনা ও উন্নয়মূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রন্তের অসংখ্য কওমি মাদরাসার শূরা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। তিনি ঈমান ও আক্বিদাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির, কওমি মাদরাসার কেন্দ্রীয় বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক) এর সহসভাপতি, খতমে নবুওয়াত আন্দোলনের সভাপতি, হাইয়াতুল উলইয়া বোর্ডের সদস্য এবং বাংলাদেশ নূরানী তালিমুল কুরআন বোর্ড চট্টগ্রাম বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান ছিলেন।
আরএস