আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ বলছেন, সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন না হলে আগের বছরগুলোর মতো এবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে চামড়া অবহেলায় পড়ে থেকে নষ্ট হবে। এতে যেমন পরিবেশ দূষণ বাড়বে, তেমনি জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
প্রতি বছর কোরবানির ঈদে দেশের কওমি মাদ্রাসা, লিল্লাহ বোর্ডিং ও এতিমখানাগুলো চামড়া সংগ্রহের মাধ্যমে একটি বড় তহবিল গড়ে তোলে। এই অর্থ দিয়েই বছরের দীর্ঘ সময় এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীদের খাবার, আবাসন ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু চামড়ার বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় সংকটে পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। আসন্ন কোরবানির জন্য জেলায় আড়াই লাখ পশু প্রস্তুত রয়েছে। সরকার ২০২৬ সালের জন্য কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করেছে। খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২০ থেকে ২২ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে সেই দামে বিক্রি হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেয়।
মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা বলেন, খাসির চামড়া সংগ্রহ করতে যেখানে পরিবহন ও সংরক্ষণে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে অনেক সময় সেই চামড়া বিক্রি করতে হয় মাত্র ৩ থেকে ৫ টাকায়। ফলে সংগ্রহ কার্যক্রমে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকে।
মুফতি আব্দুল মালেক জানান, ১৫ থেকে ২০ বছর আগে যেখানে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকায় চামড়া বিক্রি হয়েছে, বর্তমানে তা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়। জামিয়া আরাবিয়া মিফতাহুল উলূমের প্রধান মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন বলেন, দ্বীনের খাতিরে ঈদের দিন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অসহনীয় পরিশ্রম করে পশু জবাই ও চামড়া সংগ্রহ করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফলাফলের খাতায় শূন্যই থেকে যায়।
জামিয়া ইসলামিয়ার প্রধান মাওলানা আনোয়ারুল হক বলেন, চামড়ার বাজার সিন্ডিকেটমুক্ত করে উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থা চালু করতে হবে, তাহলে চামড়া সংরক্ষণ ও বিক্রিতে আবারও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। ইত্তেফাকুল ওলামার জেলা সম্পাদক মুফতি আবুল আজাদ বলেন, জেলায় সহস্রাধিক কওমি মাদ্রাসা কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করে থাকে, কিন্তু কয়েক বছর ধরে চামড়া বিক্রিতে লাভ না হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
খানকায়ে হোসাইনিয়া মাদানীয়ার তত্ত্বাবধায়ক মুফতি মাহবুবুল্লাহ কাসেমী বলেন, ঈদের আনন্দকে বিলীন করে দিনব্যাপী পশু জবাই ও চামড়া সংরক্ষণ করে কোনো লাভ না হওয়ায় বিভিন্ন জেলার মতো ময়মনসিংহের আলেমরাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন না হয় এবং ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনতে আগ্রহী না হন, তবে অনেক চামড়া রাস্তাঘাট, খোলা মাঠ বা ময়লার স্তূপে পড়ে থাকবে। এতে দুর্গন্ধ, জীবাণু সংক্রমণ ও পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা বাড়বে। তারা চামড়া সিন্ডিকেট ভেঙে বাজার স্বাভাবিক করতে স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করতে হবে, যাতে সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বিক্রি নিশ্চিত হয়।
জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, চামড়া জাতীয় সম্পদ। এটি রক্ষায় এ বছর জেলায় চামড়া ব্যবসায়ী, কসাই ও সংরক্ষণকাজে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করে যেকোনো সহযোগিতা দিতে প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়া সংরক্ষণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি দূর করা না গেলে প্রতি বছর একই সংকট ফিরে আসবে। এতে যেমন আর্থিক ক্ষতি হবে, তেমনি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি তৈরি হবে।