রফিকুল ইসলাম আরমান, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ)
আগস্ট ২৭, ২০২৫, ০৩:৫৭ পিএম
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের গণেরগাঁও গ্রামে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে শিকলবন্দি জীবন কাটাচ্ছিলেন দুই ভাই-বোন। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে চিকিৎসার জন্য।
আছমা খাতুন (২৮) ও তার ছোট ভাই জাহাঙ্গীর (২৫) পারিবারিক দারিদ্র্য ও অসহায়তার কারণে হাত-পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মাত্র ১৫ বছর বয়সে আছমা স্থানীয় একটি গার্মেন্টসে কাজ শুরু করেন। ভবিষ্যতের আশায় কিছু টাকা জমানোর পর স্থানীয় এক ব্যক্তি সেই অর্থ আত্মসাৎ করে উধাও হয়। এতে প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়ে আছমা ভারসাম্য হারান। পরে পরিবারের আশঙ্কায় তাকে ঘরে শিকলে বেঁধে রাখা হয়।
অন্যদিকে, লেখাপড়ার পাশাপাশি ব্যবসা করা জাহাঙ্গীর প্রেমঘটিত কারণে মানসিক ভারসাম্য হারান। পরিবার আশঙ্কা করে, যাতে তারা নিজেই বা অন্যকে ক্ষতি না করেন, তাই ঘরের ভেতরে শিকলে বেঁধে রাখা হয়।
আছমা-জাহাঙ্গীরের বাবা ফজলু মিয়া একজন দিনমজুর। বয়স ও দরিদ্রতার কারণে সংসার চালানো তার জন্য কঠিন। বড় বোন সালমা আক্তার বলেন, “মানুষ দিলে খাই, না দিলে উপোষ থাকতে হয়। এরই মধ্যে দুই ভাই-বোন মানসিক রোগে ভুগছে। চিকিৎসার সামর্থ্য আমাদের নেই।”
স্থানীয়রা জানান, ভাঙাচোরা ঘরের এক কোণে আছমার পা লোহার শিকলে বাঁধা থাকে, খানিকটা দূরে জাহাঙ্গীরও খুঁটিতে বাঁধা থাকেন। বছরের পর বছর রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, খেয়ে-না খেয়ে এই অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন তারা।
সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাঈদুল ইসলাম রবিবার বিকালে তাদের বাড়িতে গিয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। সোমবার দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অ্যাম্বুলেন্সে করে দুই ভাই-বোনকে ঢাকার জাতীয় মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ইউএনও মাঈদুল ইসলাম বলেন, “১২ বছর ধরে শিকলে বন্দি দুই ভাই-বোনের বিষয়টি জানার পর আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে সঙ্গে নিয়ে তাদের বাড়ি গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছি। এরপর চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করা হবে। আল্লাহর রহমতে তারা সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন।”
গ্রামের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসনের উদ্যোগে চিকিৎসার সুযোগ পেলেও পরিবারের আর্থিক দুর্দশা এখনো রয়ে গেছে। তারা আশা করছেন, সমাজের বিত্তবানরাও এগিয়ে এসে পরিবারটিকে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ প্রদান করবেন।
ইএইচ