ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
সিনেমার পর্দায় বন্দি পালানোর রোমহর্ষক দৃশ্য অনেক দেখা গেলেও, এবার বাস্তবেই জেলের ভেতর ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য 'আয়নাবাজি'। কারাগারের কঠোর নিরাপত্তা বলয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অন্য আসামির নাম ও জামিনের কাগজ ব্যবহার করে কারাগার থেকে চম্পট দিয়েছেন এক হাজতি। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে, যা নিয়ে কারা প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
ঘটনার মূল নায়ক হৃদয় মিয়া (২৮), যার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার নিমবাড়ি এলাকায়। একটি মামলার আসামি হিসেবে তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। ২৯ জানুয়ারি সকাল ১১টার দিকে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান, কিন্তু প্রকৃত অর্থে তাঁর জামিন হয়নি।
জামিন হয়েছিল মূলত নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের দিদার হোসেন (২৮) নামে অন্য এক আসামির। কারামুক্তির সময় হৃদয় কৌশলে নিজেকে 'দিদার' হিসেবে পরিচয় দেন। দিদারের নাম-ঠিকানা ও জামিনের নথিপত্র ব্যবহার করে তিনি অনায়াসে জেলের মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে যান। কর্তব্যরত কারারক্ষীরা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে, যাঁর হাতে মুক্তির টিকিট তুলে দিচ্ছেন, তিনি আসলে অন্য কেউ।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে কারা কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্বে চরম অবহেলার প্রমাণ মিলেছে। জেল সুপার মো. ওবায়দুর রহমান জানিয়েছেন, আসামির পরিচয় শনাক্তকরণে দায়িত্বরতরা যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেননি।
শাস্তির আওতায় যারা: ঘটনার পর পরই দায়িত্বে অবহেলার দায়ে ডেপুটি জেলার আজহারুল ইসলামসহ মোট সাতজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া কারারক্ষীরা হলেন:
মোরশেদ আলম, মো. হানিফ মিয়া, শাহাব উদ্দিন, রবিউল আলম, মোহাম্মদ জাহিদ হাসান এবং মোহাম্মদ আবু খায়ের।
কারা সূত্র জানায়, হৃদয় মিয়া একা এই কাজ করেননি। অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা বা কোনো বিশেষ লাভের আশায় কারাগারের ভেতরে থাকা আরও কয়েকজন অপরাধী তাঁকে এই পলায়নে সহায়তা করেছেন। দিদার হোসেন নিজেও এই চক্রান্তের অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনায় হৃদয় ও দিদারসহ মোট সাতজনের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় একটি নতুন মামলা করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছে হাজতি বিল্লাল মিয়া, কয়েদি পলাশ হোসেন, কয়েদি আক্তার হোসেন ছোটন, হাজতি শিপন মিয়া এবং হাজতি মনির হোসেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ঘটনা দেশের কারাগারগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক বড় দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে। যেখানে বায়োমেট্রিক বা ডিজিটাল শনাক্তকরণ ব্যবস্থা থাকার কথা, সেখানে কেবল মৌখিক প্রশ্নোত্তরের ওপর ভিত্তি করে আসামি মুক্তি দেওয়ার রীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এর আগে ময়মনসিংহ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যান্য ঘটনাও প্রমাণ করে যে, জেলের ভেতর আসামিদের 'আয়নাবাজি' বা রূপ পরিবর্তনের প্রবণতা বাড়ছে।
কারাগার থেকে এভাবে বন্দি পালানোর ঘটনা জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। হৃদয় মিয়াকে পুনরায় গ্রেপ্তার করতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে এভাবে কারাবন্দির পালিয়ে যাওয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
এএন