নুরুজ্জামান শেখ, শরীয়তপুর
মে ১৭, ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম
শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীতে টেন্ডারের শর্ত ভঙ্গ করে চলছে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব। প্রতিদিন ৫০-৬০টি ড্রেজার দিয়ে পদ্মার তলদেশ থেকে লাখ লাখ ঘনফুট বালু তোলা হচ্ছে। এতে নড়িয়ার পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় বিলীন হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে লক্ষাধিক মানুষের ভিটাবাড়ি।
স্থানীয় আব্দুল আউয়াল চৌকদারসহ একাধিক লোকের অভিযোগ, এই অবৈধ কার্যক্রমের নেতৃত্বে রয়েছেন নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরিদ আহম্মেদ রয়েল মাঝিসহ একটি মহল।
অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা নদীর ডান তীর রক্ষা বাঁধ বর্তমানে মারাত্মক হুমকির মুখে। বিএনপির সরকার আসার পর থেকেই পুনরায় পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নড়িয়া পৌরসভা ও নড়িয়া উপজেলার চরআত্রা, নওয়াপাড়া, ভেদরগঞ্জ উপজেলার কাচিকাটা, জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর, মুন্সীগঞ্জ জেলার হাসাইল, দিঘিরপাড় ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ ফের ভিটাবাড়ি হারানোর ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই এলাকায় ভয়াবহ ভাঙনে অন্তত ২৫ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছিল। পরে ২০১৯–২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ১০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও ১২ কিলোমিটার নদী খননে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।
নড়িয়া উপজেলা প্রশাসনের নথি অনুযায়ী, গত বছরের জুনে চরআত্রা এলাকায় স্তুপকৃত বালু অপসারণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকায় কাজ পান ‘তাসিন তাহান কনস্ট্রাকশন’। অভিযোগ রয়েছে, তারা বালু অপসারণ না করে স্তুপের পাশ থেকেই অবৈধভাবে পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে জোরপূর্বক বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে এবং কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী চরআত্রা ও নওয়াপাড়া এলাকার চরের ফসলি জমিতে পূর্বে ড্রেজিংয়ের সময় উঠিয়ে স্তুপ করে রাখা বালু সরানোর কথা থাকলেও অভিযোগ উঠেছে, তারা স্তুপের পরিবর্তে নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু তুলছেন।
বালু তোলার কাজে নিয়োজিত শ্রমিক রনি মিয়া, বকুল দেওয়ান ও স্থানীয়রা বলছেন, মুলফৎগঞ্জ, চরজুজিরা, সুরেশ্বর, কেদারপুর ও চরআত্রা এলাকায় প্রতিদিন ৫০–৬০টি কাটিং ড্রেজার দিয়ে দিন-রাত একটানা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। প্রতিটি ড্রেজার দিনে ২-৩ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করে, যা পরে বাল্কহেডে করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে সরবরাহ করা হয়। শ্রমিকরা স্বীকার করেছেন, তারা ইজারাদারের নির্দেশেই কাজ করেন, তবে কাগজপত্র তাদের হাতে নেই।
বাঁশতলা এলাকার সাইদুর রহমান ও দনু মাল বলেন, “তিনবার নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েছি। এখন বাঁধের পাশে ঘর তুলেছি। আবার ভাঙন শুরু হলে সব শেষ হয়ে যাবে।”
সুরেশ্বরের আয়না বিবি বলেন, “নদী আমাদের ঘরবাড়ি সব কেড়ে নিয়েছে। বাঁধটাই এখন শেষ আশ্রয়। এটা ভাঙলে কোথায় যাব?”
নওয়াপাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কাশেম সিদ্দিক বলেন, নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরিদ আহম্মেদ রয়েল মাঝি দলীয় প্রভাব খাটিয়ে পদ্মা তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে, ফলে আমরা আবার ভাঙনের কবলে পড়ার শঙ্কায় আছি।
জানা গেছে, নড়িয়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু অভিযান হলেও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অস্বীকার করে নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ‘তাসিন তাহান কনস্ট্রাকশন’-এর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহম্মেদ রয়েল মাঝি বলেন, “আমরা যথাস্থান থেকেই বালু উত্তোলন করছি।”
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল কাইয়ুম খান স্বীকার করেছেন, একটি প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। তিনি বলেন, বালু স্তুপ সরানোর টেন্ডারের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। তবে তারা নির্দিষ্ট স্থান থেকে বালু না সরিয়ে অপরিকল্পিতভাবে পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হবে।
জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমকে নড়িয়ায় পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে ফোন কেটে দেন।
এএন