আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জানুয়ারি ২৮, ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি হাব এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন আর যুদ্ধ মানে কেবল দুটি দেশের সীমান্ত সংঘাত নয়। বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো শক্তিশালী পক্ষ, তখন একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিতে পারে। এই মহাপ্রলয় ঠেকাতে গত কয়েক বছর ধরে পর্দার আড়ালে এক অবিশ্বাস্য 'কূটনৈতিক খেল' দেখিয়ে যাচ্ছে কাতার।
কাতারের কূটনীতি কোনো জাদুর কাঠি নয়, বরং এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা। একদিকে কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ‘আল উদেইদ’, অন্যদিকে ইরানের সাথে কাতারের রয়েছে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক (বিশেষ করে বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রের অংশীদারিত্ব)। এই দ্বিমুখী অবস্থানই কাতারকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য সেতু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
যখন দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংলাপ রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন কাতারের মাধ্যমেই অতি গোপনীয় বার্তা আদান-প্রদান হয়। দোহা এখানে কেবল ডাকপিয়ন নয়, বরং এমন এক মধ্যস্থতাকারী যারা দুই পক্ষেরই ‘মুখরক্ষা’ (Face-saving) নিশ্চিত করে সমাধানের পথ বাতলে দেয়।
কাতারের সফলতার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ছিল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস। মাসের পর মাস ধরে চলা গোপন আলাপ আর পরোক্ষ মধ্যস্থতার মাধ্যমে কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বন্দিবিনিময় এবং জব্দ থাকা বিপুল পরিমাণ ইরানি অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করে। এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি না হলেও প্রমাণ করেছিল যে, চরম বৈরিতার মধ্যেও বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী থাকলে ‘অসম্ভব’ও সম্ভব।
তবে বড় পরীক্ষাটি আসে ২০২৫ সালের জুনে। মার্কিন প্রশাসন যখন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানে এবং জবাবে ইরান কাতারের মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, তখন পরিস্থিতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সবচেয়ে বড় সংকটের রূপ নিয়েছিল। সেই উত্তাল সময়েও কাতার দ্রুত উভয় পক্ষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে এক নাজুক কিন্তু কার্যকর যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।
কাতারের এই মধ্যস্থতা কি কেবল পরোপকার? মোটেও নয়। এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ঝুঁকি বিশ্লেষণ। সুলতান আল-খুলাইফির মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা উচ্ছেদের লক্ষ্যে কোনো বড় সামরিক অভিযান শুরু হলে তার আঁচ কেবল তেহরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা: রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়লে উগ্রপন্থা ও জাতিগত দাঙ্গার উত্থান ঘটবে।
শরণার্থী সংকট: লাখ লাখ মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নেবে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে ধস নামাবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা: হরমুজ প্রণালীসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো অবরুদ্ধ হলে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
কাতার ধারাবাহিকভাবে মনে করে যে, বলপ্রয়োগ বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনতে পারে না। বরং সংলাপই একমাত্র উপায় যা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ইরানের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো চাপের মুখে পড়ায় তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। মার্কিন হামলাও প্রমাণ করেছে যে ওয়াশিংটন সরাসরি ইরানে আঘাত হানতে দ্বিধা করবে না। কিন্তু এই 'ম্যাক্সিমাম প্রেশার' নীতি কি শান্তি আনবে?
উপসাগরীয় দেশগুলোর বর্তমান মনোভাব বলছে—না। এখন কেবল কাতার নয়, সৌদি আরব এবং ওমানও তেহরানের সাথে উত্তেজনা কমানোর পথে হাঁটছে। তাদের লক্ষ্য ইরানকে আদর্শগতভাবে পরিবর্তন করা নয়, বরং এমন এক ভয়াবহ সংঘাত এড়ানো যা পুরো অঞ্চলকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিতে পারে।
কাতারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কোনো নাটকীয় বিজয় নয়, বরং এটি একটি ধীর এবং জটিল প্রক্রিয়া। সামরিক শক্তির প্রদর্শনী যতখানি দৃশ্যমান হয়, কূটনীতির সাফল্য ততখানিই নিভৃত। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে কাতার যে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছে, তা অবমূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। যে অঞ্চলে যুদ্ধের মূল্য রক্ত এবং অর্থনীতি—উভয় মাধ্যমেই দিতে হয়, সেখানে কাতারের এই ‘কূটনৈতিক খেল’ই হতে পারে মহাযুদ্ধ এড়ানোর শেষ ঢাল।
এএন