আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জানুয়ারি ৩০, ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম
রাশিয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা সাধারণ শ্রমিকের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহজ সরল বাংলাদেশিদের পাচার করা হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ ভয়াবহ তথ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শত শত বাংলাদেশি তরুণকে প্রতারণার মাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে রাশিয়ার মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের একজন মাকসুদুর রহমান। বাংলাদেশে এক দালাল তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, রাশিয়ায় গেলে তিনি ভালো বেতনে জ্যানিটর বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ পাবেন। কিন্তু মস্কো পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহ পরেই মাকসুদুরের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। তাকে কোনো সিভিল কাজের পরিবর্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক ফ্রন্টলাইনে।
মাকসুদুরের মতো আরও অনেকেই একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তারা যখন যুদ্ধের কাজের প্রতিবাদ করেছিলেন, তখন এক রুশ কমান্ডার একটি অনুবাদ অ্যাপ বা ট্রান্সলেশন অ্যাপের মাধ্যমে তাকে নির্দয়ভাবে বলেছিলেন, ‘তোমার এজেন্ট তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে। আমরা তোমাকে কিনে নিয়েছি।’
রাশিয়া থেকে কোনোমতে পালিয়ে আসা তিনজন বাংলাদেশি এপির কাছে বর্ণনা করেছেন কীভাবে তাদের ফাঁদে ফেলা হয়েছে।
তারা জানান, মস্কো পৌঁছানোর পর তাদের রুশ ভাষায় লেখা বেশ কিছু আইনি নথিতে সই করতে বাধ্য করা হয়। ভাষার সমস্যার কারণে তারা বুঝতে পারেননি যে, সেগুলো আসলে সামরিক বাহিনীর সাথে বাধ্যতামূলক চাকরির চুক্তি। সই করার পরপরই তাদের একটি বিশেষ সেনা প্রশিক্ষণ শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মাত্র কয়েক দিনে তাদের ড্রোন চালনা, ভারী অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার এবং আহতদের সরিয়ে নেওয়ার মৌলিক কলাকৌশল শিখিয়ে সরাসরি রণক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, এ বাংলাদেশিদের মূলত এমন সব কাজে লাগানো হয় যেখানে প্রাণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে রয়েছে রুশ বাহিনীর মূল আক্রমণের আগে অগ্রবর্তী দল হিসেবে এগিয়ে যাওয়া বা হিউম্যান শিল্ড, যুদ্ধক্ষেত্রে রসদ ও গোলাবারুদ বহন করা, রণক্ষেত্র থেকে আহত রুশ সেনাদের উদ্ধার করা এবং নিহত সেনাদের মৃতদেহ সরিয়ে নেওয়া।
পালিয়ে আসা শ্রমিকরা জানান, তারা যখন এ কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তখন তাদের ওপর চালানো হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘ওরা আমাদের লাথি মারত আর বলত, কাজ করছ না কেন? কাঁদছ কেন?’ এ ছাড়া কাজ না করলে ১০ বছরের কারাদণ্ডের হুমকিও দেওয়া হতো।
এপি তাদের অনুসন্ধানে ভুক্তভোগীদের ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র, রুশ সামরিক চুক্তিনামা, যুদ্ধের আঘাতের ছবি এবং চিকিৎসকদের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে। এ নথিপত্র অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশিরা সরাসরি রুশ সামরিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে বাধ্য হয়েছেন।
বর্তমানে নিখোঁজ থাকা আরও অন্তত তিনজন বাংলাদেশির পরিবার এপিকে জানিয়েছেন, তাদের স্বজনরা নিখোঁজ হওয়ার আগে ফোনে একই ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন।
এ গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত, নেপাল এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও একইভাবে টার্গেট করেছে রাশিয়া। মূলত নিজেদের সেনাসংখ্যা কম থাকায় উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র শ্রমিকদের টাকার টোপ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বলির পাঁঠা বানাচ্ছে মস্কো।
মাকসুদুরের মতো যারা সাত মাসের নরক যন্ত্রণা সয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন, তারা এখন বিভীষিকাময় দিনগুলো পার করছেন। কিন্তু এখনো ইউক্রেনের তুষারপাত ও গোলার মুখে কতশত বাংলাদেশি আটকে আছেন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যমে এ পরিস্থিতির অবসান ঘটানো এখন সময়ের দাবি।
ইএইচ