আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্চ ১৭, ২০২৬, ০৬:০১ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক নাটকীয় এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড় নিয়েছে ইরানের রাজনীতি। প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মঙ্গলবার বিকেলে একজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যস্থতাকারী দুটি দেশের মাধ্যমে ওয়াশিংটন তেহরানের কাছে উত্তেজনা কমানো এবং একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবটি দেওয়া হয়।
তবে নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর প্রথম পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক অধিবেশনেই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, এখন আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। ওই কর্মকর্তা জানান, মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর এবং অনমনীয় মনোভাব পোষণ করছেন। যদিও তিনি ওই অধিবেশনে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে, তবে তাঁর এই সিদ্ধান্ত ইরানের ভবিষ্যৎ রণকৌশলের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাহাদাতের পর (যিনি ইসরায়েল ও মার্কিন হামলায় নিহত হন) ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ জরুরি বৈঠকে বসে। দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তারা মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে।
বিশেষজ্ঞ পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মোজতবা খামেনি একজন ‘ন্যায়পরায়ণ, জ্ঞানবান, ধর্মপ্রাণ ও বিচক্ষণ’ ব্যক্তি। তাকে নেতা হিসেবে নির্বাচন করা পরিষদের এক অনন্য বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বলে সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, তাই মোজতবা খামেনির এই দায়িত্ব গ্রহণ পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য পাল্টে দিতে পারে।
নতুন নেতার প্রতি সংহতি প্রকাশে দেরি করেনি ইরানের প্রভাবশালী সামরিক শক্তিগুলো। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিশেষ বিবৃতিতে আইআরজিসি মোজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তারা তাঁর প্রতি ‘আন্তরিক ও আজীবন আনুগত্য’ ঘোষণা করে বলেছে, সর্বোচ্চ নেতার প্রতিটি আদেশ পালন করতে তারা সদা প্রস্তুত।
ইরানের মূল সেনাবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীও একযোগে নতুন নেতার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে। আইআরজিসি-র এই সমর্থন মোজতবা খামেনির ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোজতবা খামেনির যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করার পেছনে প্রধান কারণ হলো ব্যক্তিগত এবং জাতীয় আবেগ। তাঁর বাবা এবং দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু ইরানের জন্য এক বিশাল ধাক্কা। মোজতবা খামেনির বর্তমান অবস্থান প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল বাবার উত্তরসূরি নন, বরং বাবার অসমাপ্ত লড়াই এবং বদলা নেওয়ার মানসিকতা নিয়েই ক্ষমতায় বসেছেন।
ওয়াশিংটন যখন চাইছে আলোচনার টেবিলে বসে সংঘাত থামাতে, তেহরান তখন পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই অনমনীয়তা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মোজতবা খামেনির এই সিদ্ধান্ত বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর জন্য একটি বড় বার্তা। বাইডেন বা পরবর্তী মার্কিন প্রশাসন যে কূটনৈতিক পন্থায় সংকট সমাধানের আশা করেছিল, তা বড় ধরণের ধাক্কা খেল।
ইসরায়েল যখন দাবি করছে যে তারা ইরানের কমান্ড স্ট্রাকচার ধ্বংস করে দিয়েছে, তখনই নতুন নেতার নেতৃত্বে ইরানের এই ঘুরে দাঁড়ানো এবং প্রতিশোধের অঙ্গীকার তেল আবিবের জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ। কাতার বা ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো যারা পর্দার আড়ালে কাজ করছিল, তাদের প্রচেষ্টা এখন হিমাগারে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
১৭ মার্চ ২০২৬ তারিখটি ইরানের ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একদিকে নতুন নেতৃত্বের অভিষেক, অন্যদিকে শান্তির প্রস্তাব ছুড়ে ফেলে যুদ্ধের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত ইরানকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান কি পারবে তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে? নাকি এই প্রতিশোধের নেশা পুরো অঞ্চলকে ছাই করে দেবে?
বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে তেহরানের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের দিকে। কারণ, মোজতবা খামেনি আজ কেবল যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেননি, তিনি ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যুদ্ধের ময়দানেই ফয়সালা হবে।
সূত্র: রয়টার্স, এএফপি এবং ইরানি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা।
এএন