আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ০৪:১১ পিএম
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আকাশে এখন নির্বাচনের মেঘ। প্রথম দফার ভোটগ্রহণের প্রাক্কালে দিল্লির রাজনীতি থেকে কলকাতার অলিগলি সবখানেই আলোচনা একটাই: কার দখলে যাবে বাংলার মসনদ? এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সাম্প্রতিক বার্তা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে মেরুকরণের সৃষ্টি করেছে।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক ঘোষণায় তিনি সাফ জানিয়েছেন, এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি ভারতের আত্মা রক্ষার ‘আদর্শিক মহাযুদ্ধ’।
রাহুল গান্ধী তাঁর বক্তব্যে সরাসরি কেন্দ্রীয় ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে আক্রমণ করে দাবি করেছেন যে, বিজেপি শাসন ব্যবস্থাকে জনগণের অধিকার হরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন ভারতের সংবিধান রক্ষার লড়াই। তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলেন, কংগ্রেস সবসময় সাধারণ মানুষের অধিকারের গ্যারান্টি দেয়, যেখানে বিজেপি কেবল সেই অধিকারগুলো সংকুচিত করার চেষ্টায় লিপ্ত।
রাহুল অত্যন্ত কৌশলে বাংলার মানুষের আবেগ এবং জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বিজেপির 'এক দেশ, এক আদর্শ' নীতির বিপরীতে কংগ্রেসই পারে ভারতের বহুত্ববাদ ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ‘বহিরাগত’ ইস্যু বা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অভিযোগ একটি বড় ফ্যাক্টর। রাহুল গান্ধী তাঁর বার্তায় এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিজেপি ভারতের বিচিত্র রঙকে মুছে দিয়ে একক রঙে দেশকে রাঙাতে চায়, যা বাংলার সমৃদ্ধ সংস্কৃতির জন্য বড় হুমকি।
কংগ্রেস নেতার মতে, বাংলা সবসময় ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। আর কংগ্রেসই সেই দল, যারা প্রতিটি আঞ্চলিক ভাষা, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে যথাযথ সম্মান দিতে জানে। তিনি ভোটারদের আশ্বস্ত করেছেন যে, কংগ্রেসের জয় মানেই বাংলার স্বতন্ত্র পরিচিতি সুরক্ষিত হওয়া।
নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি রাহুল গান্ধী বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তনের কড়া সমালোচনা করেছেন। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তিনি অভিযোগ তোলেন যে, এটি সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা তৈরির একটি পরিকল্পিত নীল নকশা।
তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকারই সর্বোচ্চ শক্তি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার যদি কৌশলে সেই তালিকায় প্রভাব বিস্তার করে, তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা হুমকির মুখে পড়ে। তিনি পশ্চিমবঙ্গের সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা এই ধরনের কোনো ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত না করে সাহসের সাথে নিজের অধিকার প্রয়োগ করেন।
রাহুল গান্ধী কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। এই সপ্তাহেই তাঁর শ্রীরামপুর, মেটিয়াবুরুজ এবং কলকাতার হৃদপিণ্ডে জনসভা করার কথা রয়েছে। কিন্তু প্রচারণার এই চূড়ান্ত সময়ে এসে তিনি অভিযোগ তুলেছেন যে, তাঁর জনসভাগুলোর অনুমতি প্রদানে প্রশাসন অহেতুক দীর্ঘসূত্রিতা এবং সমস্যার সৃষ্টি করছে।
কংগ্রেস শিবিরের দাবি, রাহুলের জনপ্রিয়তা এবং তাঁর তীক্ষ্ণ বক্তব্যে ভীত হয়েই এই ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে হেভিওয়েট নেতাদের সভা ঘিরে এই ধরনের জটিলতা ভোটের মাঠে উত্তাপ বাড়িয়ে দেয় এবং ভোটারদের সহানুভূতি পাওয়ার ক্ষেত্রেও কাজ করে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটযুদ্ধকে অনেকেই তৃণমূল ও বিজেপির দ্বৈরথ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু রাহুল গান্ধীর এই আক্রমণাত্মক ঢঙের প্রচারণা প্রমাণ করে যে, কংগ্রেস এই লড়াইয়ে নিজেদের 'আসল বিকল্প' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোট এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশ, যারা বিজেপি এবং বর্তমান শাসক দল—উভয়ের ওপরই বীতশ্রদ্ধ, তাদের কাছে টানাই রাহুলের মূল লক্ষ্য।
বাম দলগুলোর সাথে আসন সমঝোতার মাধ্যমে কংগ্রেস এবার বাংলায় একটি মজবুত ফ্রন্ট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। রাহুলের 'আদর্শের লড়াই' স্লোগান মূলত সেই ভোটারদেরই উদ্বুদ্ধ করার কৌশল, যারা মনে করেন ভারতের গণতান্ত্রিক ভিত্তি রক্ষায় কংগ্রেসের কোনো বিকল্প নেই।
রাহুল গান্ধীর এই বার্তা এবং তাঁর আসন্ন সফর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের গতিপথ কতটা পরিবর্তন করবে, তা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, তিনি এই নির্বাচনকে কেবল আঞ্চলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি জাতীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষায়, এটি হলো ভারতের সংবিধান ও সংস্কৃতির রক্ষার অন্তিম লড়াই। এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েক দফার ভোটগ্রহণে বাংলার মানুষ এই 'আদর্শের লড়াইয়ে' কার পাশে দাঁড়ায়।
এএন