গ্যাস-সংযোগের চরম হাহাকার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬, ০৪:১০ পিএম
গ্যাস-সংযোগের চরম হাহাকার

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশে দ্রুত শিল্পায়নের এক বিশাল স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। ‘বিনিয়োগ করুন, অবকাঠামো ও গ্যাস-বিদ্যুৎ মিলবে’ এমনই নীতিগত আশ্বাসের ওপর ভরসা করে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বিশাল সব কারখানা গড়ে তুলেছিলেন কিন্তু বাস্তবতার নির্মম পরিহাস, বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুত গ্যাস-সংযোগ আর মেলেনি।

বর্তমানে দেশের শিল্প খাতের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। একদিকে বন্ধ বা গ্যাস-সংযোগহীন অবস্থায় পড়ে আছে হাজার হাজার কোটি টাকার উৎপাদনক্ষম আন্তর্জাতিক মানের কারখানা, অন্যদিকে ব্যাংক থেকে নেয়া দেশি-বিদেশি ঋণের সুদের মিটার ঘুরছে প্রতি সেকেন্ডে, কারখানা চালু না থাকলেও ব্যবসায়ীদের নিয়মিত কোটি কোটি টাকা সুদ গুনে যেতে হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ওপর এক বিরাট কালো মেঘ তৈরি করেছে। উৎপাদনহীন এই ঋণের বোঝা দেশের ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক চরম সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে, ঢাকা থেকে মাত্র ৩২ কিলোমিটার দূরে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় ৩৬১ একর জমির ওপর বেসরকারি উদ্যোগে ‘কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তুলেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে দুটি সুবিশাল কারখানা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে একটি কাচ তৈরির (মেঘনা গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড) এবং অন্যটি রডের (মেঘনা রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস লিমিটেড)।

এমজিআই যখন এই বিপুল অংকের বিনিয়োগ শুরু করে, তখন সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাদের গ্যাস-সংযোগের শতভাগ আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। সরকারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তারা নিজেরাই নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা খরচ করে গ্যাসলাইন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করে কিন্তু আজ আড়াই বছর পার হলেও সেই লাইনে গ্যাসের দেখা মেলেনি।

এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল ২০ জুন এক সভায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই বিনিয়োগ সম্পূর্ণ বিদেশি ঋণে (বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর আইএফসি থেকে) করা হয়েছে। বিদেশি ঋণ তো আর দেশীয় ব্যাংকের মতো পুনঃ তফসিল (রিশিডিউল) করা যায় না, সুদও মাফ পাওয়া যায় না; গ্যাস না পেলে এই কারখানা দুটি কোনোভাবেই চালু করা সম্ভব নয়।’ তার মতে, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে সাতটি কারখানায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা ছিল, যার সবকিছুই এখন গ্যাসের অভাবে পুরোপুরি থমকে আছে।

কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে সরেজমিন গিয়ে যে ভয়াবহ ও হতাশাজনক চিত্র দেখা যায়, তা দেশের শিল্পায়নের প্রকৃত অবস্থাকে ফুটিয়ে তোলে। মহাসড়ক থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবেশের একমাত্র সংযোগ সড়কটির অবস্থা অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও খানাখন্দে ভরা। সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে পানি জমে যায়, যার মধ্য দিয়ে ভারী যানবাহন বা শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন প্রায় অসম্ভব।

অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে কারখানার মূল ভবন, প্রশাসনিক কার্যালয় এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের আবাসন ভবনগুলোর নির্মাণকাজ অনেক আগেই নিখুঁতভাবে শেষ করে রাখা হয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি ও লাইন ঝুলছে, মাটির নিচ দিয়ে টানা হয়েছে ৫৫০ কোটি টাকার গ্যাসের পাইপলাইন- সবই প্রস্তুত, শুধু নেই মূল গ্রিড থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংযোগের মূল সরবরাহ। কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) সুমন চন্দ্র ভৌমিক জানান, বিগত সরকারের সময় এই রাস্তাটি সংস্কার ও প্রশস্ত করার জন্য ১,৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হলেও তা পাস হয়নি। বর্তমান সরকারও তীব্র অর্থসংকটের কারণে প্রকল্পটির অনুমোদন দিতে পারেনি, যা এই শিল্পাঞ্চলের সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।

গ্যাসের এই তীব্র হাহাকার শুধু এমজিআই-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশের আরও দুটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ ও হা-মীম গ্রুপও একই ফাঁদে পড়ে চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। ক. সিটি গ্রুপের ১৪ হাজার কোটি টাকার অলস বিনিয়োগ: দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের অধীনে বর্তমানে ৪০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত।

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় ১০৮ একর জমিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত ‘হোসেন্দি অর্থনৈতিক অঞ্চলে’ পাঁচটি মেগা শিল্পকারখানা (সিমেন্ট, চিনি, কাগজ, জাহাজ নির্মাণ এবং এলপিজি) সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে রেখেছে তারা। এখানে তাদের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ সম্পূর্ণ অলস পড়ে আছে শুধু গ্যাসের অভাবে। সিটি গ্রুপ নিজস্ব ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাইপলাইন নির্মাণ করে দেয়ার পরও সরকার গ্যাস সরবরাহ করতে পারেনি।

গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের প্রায় ৫ কোটি টাকা করে শুধু ব্যাংক সুদ গুনতে হচ্ছে। এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি আমরা আর কত দিন টানব, তা আমাদের জানা নেই।’ খ. হা-মীম গ্রুপের বস্ত্র কারখানার অপেক্ষা: দেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ জানান, গাজীপুরের মাওনায় তারা একটি আধুনিক বস্ত্র কারখানা (টেক্সটাইল মিল) স্থাপন করেছেন। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ করে গ্যাস-সংযোগের জন্য দুই বছর আগেই সরকারের কোষাগারে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দেয়া হয়েছে কিন্তু দুই বছর ধরে টাকা জমা থাকার পরও আজ পর্যন্ত কারখানাটিতে গ্যাস-সংযোগ দেয়া হয়নি, যার ফলে উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এই সংকটের ভয়াবহতা অনুধাবন করে গত ২০ এপ্রিল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিবকে একটি জরুরি আধাসরকারি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, দ্রুত গ্যাস-সংযোগ দিতে না পারলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে না এবং ভবিষ্যতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে সম্পূর্ণ নিরুৎসাহিত হবেন।

পেট্রোবাংলা এবং তিতাস গ্যাসসহ দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, শিল্প খাতে নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির জন্য ১,৮০০টিরও বেশি আবেদন ঝুলে আছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দেয়াসহ সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ‘প্রতিশ্রুত সংযোগের’ অপেক্ষায় দিন গুনছে।

দেশে বর্তমান গ্যাস-সংকটের মূল শিকড় প্রোথিত রয়েছে বিগত দেড় দশকের ভুল, আমদানিনির্ভর ও চরম দুর্নীতিগ্রস্ত জ্বালানি নীতির মধ্যে। ২০০৯ সালের জুলাই থেকে শিল্পে এবং ২০১০ সালের জুলাই থেকে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস-সংযোগ সরকারিভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। মাঝখানে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটির মাধ্যমে কিছু কারখানাকে বিশেষ বিবেচনায় সংযোগ দেয়া হলেও সেই কমিটির বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যার ফলে পরবর্তীতে তা বাতিল করা হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যার বিপরীতে পেট্রোবাংলা সরবরাহ করতে পারছে মাত্র ২৭০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ, প্রতিদিন প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়ে গেছে। মোট সরবরাহের মধ্যে শিল্প খাতে যাচ্ছে ১২০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। পেট্রোবাংলার হিসাব মতে, বর্তমানে যে ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান টাকা জমা দিয়ে সংযোগের অপেক্ষায় আছে, শুধু তাদের লাইন চালু করতেই আরও অতিরিক্ত ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন।

দেশে বর্তমানে কার্যরত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের উত্তোলনযোগ্য মজুত যেভাবে কমছে, তাতে বর্তমান হারে ব্যবহার করলে আগামী ৭ থেকে ৮ বছরের মধ্যে তা সম্পূর্ণ ফুরিয়ে যাবে। বর্তমান সরকার নতুন কূপ খনন এবং সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করলেও নতুন ক্ষেত্র থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আসতে অন্তত ৪ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে।

একটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হলো তার শিল্প খাত। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে কারখানা বন্ধ রাখা এবং উৎপাদন ছাড়াই ব্যাংক সুদের বোঝা বয়ে বেড়ানো কোনো সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ হতে পারে না। এটি কেবল ব্যক্তিগতভাবে মোস্তফা কামাল বা এ কে আজাদের ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় উৎপাদন (এউচ), রপ্তানি আয় এবং ১৫ থেকে ২০ হাজার সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ধ্বংসের শামিল।