ঝুলে আছে হাজার কোটির প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬, ০৪:২১ পিএম
ঝুলে আছে হাজার কোটির প্রকল্প

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল ভৌগোলিক কারণেই দেশের অন্যান্য সমতল ভূমি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও অনগ্রসর। এই দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় একটি স্থায়ী কাঠামোগত রূপান্তর আনার লক্ষ্যে সরকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। ৯৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের এই মহতী উদ্যোগের নাম ‘হাওর এলাকার নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্প।

হাওরের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে এই প্রকল্প নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বাস্তবায়নের মাঝপথে এসে প্রকল্পটি তার কাঙ্ক্ষিত গতি হারিয়ে পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম কার্যত থমকে আছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি সন্তোষজনক বলে মনে হলেও, তারপর থেকেই মাঠপর্যায়ে কাজের গতি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়।

এই দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার কারণে হাওরবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এখন ফিকে হতে বসেছে, যার ফলে স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই মেগা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল হাওরাঞ্চলের অনগ্রসর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি নিরাপদ, আধুনিক ও বৈষম্যহীন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা।

এই মহাপরিকল্পনার আওতায় দেশের অন্যতম দুটি প্রধান হাওরবেষ্টিত জেলা নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের মোট ১৬টি দুর্গম উপজেলার নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেছে নেয়া হয়েছিল। প্রকল্পের প্রধান অবকাঠামোগত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল- বহুমুখী একাডেমিক ভবন : শিক্ষার্থীদের আধুনিক শ্রেণিকক্ষের অভাব দূর করতে বহুতল বহুমুখী ভবন নির্মাণ।

ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাস স্থাপন : দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক আবাসন সুবিধা নিশ্চিতকরণ। শিক্ষক ডরমেটরি : দুর্গম এলাকায় শিক্ষকদের থাকার সুব্যবস্থা করা, যাতে তারা পাঠদানে আরও বেশি মনোযোগী হতে পারেন। নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা : প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের চারপাশ সুরক্ষিত করতে সীমানা প্রাচীর ও দৃষ্টিনন্দন গেট নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা। পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো প্রকল্পটির এই হঠাৎ স্থবিরতার পেছনে বেশ কিছু মারাত্মক অভ্যন্তরীণ ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ চিহ্নিত করেছে।

কমিশনের মতে, এই অচলাবস্থার প্রধান কারণগুলো হলো- ১. চরম প্রশাসনিক দুর্বলতা, ২. তদারকির ভয়াবহ ঘাটতি, এবং ৩. মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র সমন্বয়হীনতা। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে প্রকল্পটির নেতৃত্ব বা অভিভাবকত্বহীনতার জায়গা থেকে। একটি প্রায় হাজার কোটি টাকার মেগা প্রজেক্ট যেখানে সার্বক্ষণিক ও দক্ষ তদারকির দাবি রাখে, সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে মূল ‘প্রকল্প পরিচালক’ পদটি সম্পূর্ণ শূন্য ছিল। সম্পূর্ণ অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জোড়াতালি দিয়ে এই বিশাল ও জটিল প্রকল্প পরিচালনার চেষ্টা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব না থাকায় ঠিকাদারদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়নি এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

বাস্তবায়ন পরিস্থিতি সরেজমিনে এবং পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে দেখতে গেলে স্পষ্ট হয় যে, প্রকল্পের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাজ বন্ধ হয়ে আছে এবং কিছু ক্ষেত্রে কাজের মান নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের মোট বাজেট প্রায় ৯৪৫ কোটি টাকা হলেও, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত সামগ্রিক মোট ব্যয় হয়েছে মাত্র প্রায় ৩৮২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এত বড় অঙ্কের আর্থিক বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও খরচের এই ধীরগতি পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে যে, প্রকল্পটি তার মূল সময়সীমা ও কাঙ্ক্ষিত গতিপথ থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে।

প্রকল্পটির এই থমকে যাওয়ার পেছনে কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই দায়ী নয়, বরং কিছু বাস্তব ও আর্থিক সংকটও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঠিকাদারদের সময়মতো বিল পরিশোধ না করা বা বিল পাসে দীর্ঘ বিলম্ব হওয়া কাজ বন্ধ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বিল না পাওয়ায় অনেক ঠিকাদার মাঝপথে কাজ ফেলে সাইট থেকে চলে গেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাওরাঞ্চলের নিজস্ব প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক অনতিক্রম্য চ্যালেঞ্জ।

যোগাযোগের দুর্গমতা : বর্ষাকালে হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নৌ-নির্ভর হয়ে পড়ে, যার ফলে ভারী নির্মাণসামগ্রী পরিবহন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ : অনাকাঙ্ক্ষিত ও মৌসুমি বন্যা, অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বছরের একটা বড় সময় কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়।

বৈশ্বিক ও স্থানীয় বাজার পরিস্থিতি : আন্তর্জাতিক বাজারে রড, সিমেন্টসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে দক্ষ শ্রমিকের তীব্র সংকট কাজের গতিকে আরও মন্থর করে তুলেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকল্পটির মূল সময়সীমা (যা ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছিল) বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

তবে সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, মেয়াদ বাড়ানো হলেও প্রকল্পটিতে নতুন করে কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করেন যে, বিদ্যমান বাজেটের অবশিষ্টাংশ দিয়েই কাজ শেষ করা সম্ভব, তবে বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এটি কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তার চেয়েও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে প্রকল্পটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে। পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্মাণকাজ, সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিল পাসের ক্ষেত্রে প্রচলিত সরকারি নিয়মকানুন সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি, যার ফলে নানাবিধ অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। প্রকল্পের মূল অবকাঠামো বা ভবন নির্মাণে স্থবিরতা থাকলেও, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আসবাবপত্র ক্রয়ের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছেন যে, মেয়াদ বৃদ্ধির পর অবশিষ্ট এই কাজগুলো নির্ধারিত নতুন সময়সীমার মধ্যেই শেষ করার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সর্বোপরি, ‘হাওর এলাকার নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন’ প্রকল্পটি কেবল ইট, বালু আর সিমেন্টের কিছু ভবনের সমষ্টি নয়; এটি হাওরাঞ্চলের লাখো সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের এক ঐতিহাসিক দলিল। এই প্রকল্প যদি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়, তবে হাওরের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আবাসন কষ্ট দূর হবে, মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসার হার বাড়বে এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশে একটি যুগান্তকারী ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।