যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতিতে এক নজিরবিহীন নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
শুক্রবার দেওয়া এক ঐতিহাসিক রায়ে আদালত জানিয়েছেন, ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করেছেন। তবে এই রায়ের পরপরই ক্ষুব্ধ ট্রাম্প পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বের সকল দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ ঢালাও শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের ৯ জন বিচারপতির মধ্যে ৬ জনই ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের আইনগত ভিত্তিকে নাকচ করে দিয়েছেন। ট্রাম্প ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে এই শুল্ক বসিয়েছিলেন। কিন্তু আদালত রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, এই আইন প্রেসিডেন্টকে এমনভাবে শুল্ক আরোপের একচ্ছত্র ক্ষমতা দেয় না। তিন বিচারপতি ট্রাম্পের পক্ষে থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে এই পদক্ষেপকে এখতিয়ারবহির্ভূত বলে গণ্য করা হয়েছে।
আদালতের এই রায় আসার পরপরই হোয়াইট হাউসে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এই রায়কে জাতির জন্য অসম্মান বলে অভিহিত করেন এবং বিচারপতিদের কড়া সমালোচনা করেন। ট্রাম্প বলেন, আমি কিছু বিচারপতির জন্য সত্যিকারে লজ্জা বোধ করছি। তাঁরা আমেরিকার স্বার্থের চেয়ে বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোযোগী। তিনি আরও দাবি করেন, এই শুল্ক ছিল আমেরিকার অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার।
বাংলাদেশের জন্য এই রায় এবং ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা, উভয়ই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গত বছর ট্রাম্প যখন ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তখন বাংলাদেশের পোশাক খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে। কয়েক দফা আলোচনার পর সেই শুল্ক ২০ শতাংশে নেমে আসে। এমনকি চলতি ফেব্রুয়ারির শুরুতে একটি বিতর্কিত বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে তা ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ সাধারণ শুল্কের সঙ্গে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক যোগ হয়ে মোট শুল্ক হার দাঁড়িয়েছিল ৩৪ শতাংশে। আদালতের রায়ে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক অবৈধ হয়ে গেলেও ট্রাম্পের নতুন ১০ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা সমীকরণটি পাল্টে দিয়েছে। যদিও মোট শুল্ক হার এখন ঠিক কত হবে, তা নিয়ে এখনও অস্পষ্টতা রয়েছে, তবে এটি যে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে রাখবে, তা নিশ্চিত।
সুপ্রিম কোর্টের রায়কে পাশ কাটিয়ে শুল্ক আদায়ের জন্য ট্রাম্প এখন ভিন্ন পথ খুঁজছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইন বা ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগ করে তিনি আবারও বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করতে পারেন। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, ভারতের মতো যেসব দেশের সঙ্গে ইতোমধ্যে বিশেষ বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে, সেগুলো সম্ভবত বহাল থাকবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া সাম্প্রতিক চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি সরাসরি কিছু না বললেও শুল্কের হুমকিকে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই পার্থেননের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকো মনে করেন, আদালতের রায়ের ফলে গড় শুল্ক হার সাময়িকভাবে কমলেও ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দেবে।
তাঁর মতে ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক আদায়ের জন্য অন্য আইনি পথ খুঁজছে, যার ফলে রপ্তানিকারক দেশগুলোর অনিশ্চয়তা কাটছে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ এখন হোয়াইট হাউস বনাম সুপ্রিম কোর্ট লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। একদিকে আদালতের নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে ট্রাম্পের একরোখা জেদ, এই দুইয়ের চাপে বিশ্ব অর্থনীতি ও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানি বাণিজ্য এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের এই নতুন ঘোষণা কার্যকর হলে তা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করবে। বিশেষজ্ঞ মহলে এখন মূল আলোচনা হলো, ট্রাম্পের এই নতুন জেদ বিশ্ববাজারকে কোন দিকে নিয়ে যায়।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন