বিশ্বের অন্যতম দুর্গম দেশ ভুটান: উন্মোচিত হচ্ছে এক নতুন দিগন্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ২, ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম
বিশ্বের অন্যতম দুর্গম দেশ ভুটান: উন্মোচিত হচ্ছে এক নতুন দিগন্ত

হিমালয়ের পর্বতমালায় ঘেরা ভুটান দীর্ঘকাল ধরে বাইরের বিশ্বের জন্য একটি রহস্যময় এবং দুর্গম দেশ হিসেবে পরিচিত। তবে সেই ধারণাকে বদলে দিতে এবং পর্যটন শিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ডাক দিয়ে এবার দক্ষিণ ভুটানের গেলেফুতে গড়ে উঠছে এক বিশাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং এক উচ্চাভিলাষী ‘মাইন্ডফুলনেস সিটি’ (GMC)।

এই প্রকল্পটি কেবল ভুটানের মানচিত্রই বদলে দেবে না, বরং হিমালয় কন্যা এই দেশটিকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য আরও সহজলভ্য করে তুলবে।

চলতি বছরের শুরুতে এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুককে দেখা যায় ভারত সীমান্তের কাছে দক্ষিণ নিম্নভূমির গেলেফু শহরে। সেখানে ১২,০০০ স্বেচ্ছাসেবকের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি জঙ্গল পরিষ্কারের কাজে অংশ নেন। এই জঙ্গল পরিষ্কারের মাধ্যমেই সূচিত হচ্ছে 'গেলেফু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর'-এর নির্মাণ কাজ, যা ২০২৯ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

এই বিমানবন্দরটি নির্মাণের আগেই এর নকশার জন্য '২০২৫ ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচার ফেস্টিভ্যাল'-এ 'ফিউচার প্রজেক্ট অফ দ্য ইয়ার' পুরস্কার জয় করেছে। এর স্থাপত্যে ব্যবহার করা হচ্ছে ভুটানি কাঠ, যা আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করবে এবং বিমানবন্দরের ভেতরেই থাকবে ইয়োগা, ধ্যান এবং ‘গং বাথ’-এর মতো আধ্যাত্মিক প্রশান্তির সুব্যবস্থা।

ভুটান ঐতিহাসিকভাবে একটি "হারমিট নেশন ‘বা নির্জন দেশ হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৪ সালের আগে এখানে পর্যটকদের প্রবেশাধিকার ছিল না বললেই চলে। ভুটান বরাবরই High Value, Low Volume" নীতি মেনে চলেছে, যাতে গণ-পর্যটনের প্রভাবে তাদের সংস্কৃতি ও পরিবেশ নষ্ট না হয়।

বর্তমানে ভুটানের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলো ‘পারো’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,২৪৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই বিমানবন্দরটি বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ের সরু ভাঁজে অবস্থিত হওয়ায় এবং কোনো রাডার সহায়তা ছাড়া কেবল চোখের দেখায় বিমান নামাতে হয় বলে বিশ্বের মাত্র ৫০ জনেরও কম পাইলটের এখানে বিমান চালানোর যোগ্যতা রয়েছে। ফলে পর্যটকদের জন্য ভুটান ভ্রমণ যেমন ব্যয়বহুল ছিল, তেমনই ছিল সময়সাপেক্ষ।

ভুটান তার জাতীয় উন্নতি পরিমাপ করে 'গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস' বা স্থূল জাতীয় সুখের মাধ্যমে। রাজা ওয়াংচুকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি হবে এমন একটি প্রশাসনিক অঞ্চল যেখানে ২০৬০ সালের মধ্যে ১০ লক্ষ ভুটানি ও বিদেশি নাগরিক বসবাস করবেন।

কোভিডের পর ভুটানের তরুণ প্রজন্মের দেশত্যাগের হার বেড়ে গিয়েছিল। এই শহরটি বিপুল কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে। এতদিন পর্যটকরা কেবল পারো, থিম্পু বা পুনাখাকে কেন্দ্র করে ভ্রমণ করতেন। নতুন এই বিমানবন্দর দক্ষিণ ভুটানের অস্পৃশ্য বন্যজীবন এবং আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরবে। গেলেফু থেকে ভারতের আসাম পর্যন্ত ৬৯ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা হবে ভুটানের ইতিহাসের প্রথম রেলপথ।

ভুটানের দক্ষিণ অঞ্চলটি উত্তর বা মধ্যভাগের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে পাহাড়ি উপত্যকার বদলে রয়েছে ঘন ক্রান্তীয় বনভূমি, এলাচ ও কমলার বাগান এবং উষ্ণ প্রস্রবণ। গেলেফুর দুই পাশে অবস্থিত ‘রয়্যাল মানস ন্যাশনাল পার্ক’ হলো ভুটানের প্রথম জাতীয় উদ্যান। এখানে পর্যটকরা খুব কাছ থেকে হাতি, বাঘ, গণ্ডার, ক্লাউডেড লেপার্ড এবং সোনালী ল্যাঙ্গুর দেখতে পাবেন। এছাড়া বিশ্বের অর্ধেক বিপন্ন সাদা-পেটযুক্ত বক এই এলাকাতেই বাস করে।

২০২৮ সালে চালু হতে যাওয়া ১৬৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথটি দক্ষিণ ভুটানের জঙ্গলকে মধ্য ভুটানের আধ্যাত্মিক প্রাণকেন্দ্রের সাথে যুক্ত করবে। বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সেখানে রিট্রিট সেন্টার এবং মন্দির নির্মাণের জন্য। রাফটিং, বার্ড ওয়াচিং এবং বাঘের সন্ধানে ট্র্যাকিং করার সুবিধা থাকবে এই অঞ্চলে।

গেলেফুর পুরোনো শহরটিকেও নতুন করে সাজানো হচ্ছে। পর্যটকরা এখানে দক্ষিণের 'লোৎশাম্পা' সম্প্রদায়ের থালি ও ডাল থেকে শুরু করে ভুটানের ঐতিহ্যবাহী ঝাল ও পনিরের তরকারি 'এমা দাতশি'র স্বাদ নিতে পারবেন। এছাড়াও হেরিটেজ ভিলেজে ভুটানের ১৩টি ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও কারুশিল্প প্রদর্শিত হবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান জিএমসি গভর্নর ড. লোটে শেরিং বলেন,আমাদের কাছে রয়েছে আদিম জঙ্গল আর অরণ্যের প্রকৃত বাঘ। এটাই আমাদের রত্ন।

ভুটান তার রহস্যময়তা ও আধ্যাত্মিকতা বজায় রেখেই আধুনিক বিশ্বের সাথে যুক্ত হতে চাইছে। গেলেফু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং মাইন্ডফুলনেস সিটি কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়, এটি ভুটানের টিকে থাকার এবং সমৃদ্ধ হওয়ার এক নতুন দর্শন। 

২০২৯ সালে যখন এই বিমানবন্দরটি চালু হবে, তখন বিশ্ব দেখবে কীভাবে আধুনিকায়ন ও আধ্যাত্মিকতা হাত ধরাধরি করে চলতে পারে। হিমালয়ের এই দুর্গম স্বর্গটি তখন কেবল দেখার জন্য নয়, বরং অনুভব করার জন্য সবার জন্য উন্মুক্ত হবে।

এএন