চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার মাঝেই আজ থেকে কার্যকর হলো ভারত ও ওমানের মধ্যকার ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক নাম 'কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট' বা সেপা । গত বছরের ডিসেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মাস্কাট সফরের সময় এই চুক্তিতে উভয় দেশ স্বাক্ষর করেছিল।
ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এই চুক্তি কার্যকরের ঘোষণা দিয়ে একে ভারতের অর্থনীতির জন্য একটি ‘যুগান্তকারী মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি জানান, এই চুক্তির ফলে ভারতের শিক্ষার্থী, কারিগর, নারী, কৃষক, জেলে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য বৈশ্বিক সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে; যা ভারতের রপ্তানি বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যাপক বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কেন এই চুক্তি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীর আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর।
বিশ্বের মোট দৈনিক খনিজ তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের ২৫ শতাংশ এই সংকীর্ণ নৌপথটি দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে একে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল ‘চোকপয়েন্ট’ বা প্রতিবন্ধক বিন্দু বলা হয়।
এই সংকটের সময়েই ভারত-ওমান বাণিজ্য চুক্তির আসল গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে। ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে ভারতে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে।
কিন্তু পারস্য উপসাগরের অন্যান্য দেশের মতো ওমানকে পণ্য বা জ্বালানি পরিবহনের জন্য সম্পূর্ণভাবে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভর করতে হয় না। ওমানের দীর্ঘ উপকূলরেখার সিংহভাগই হরমুজ প্রণালীর বাইরে- সরাসরি আরব সাগর এবং ওমান উপসাগরের সাথে যুক্ত।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় থিঙ্ক ট্যাংক 'গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ' -এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব জানান, ওমানের এই অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালীতে ট্রাফিক বা যুদ্ধবিগ্রহজনিত অচলাবস্থা তৈরি হলেও ওমানের প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দর- 'সালালাহ' এবং 'দুকম' সম্পূর্ণ সচল ও নিরাপদ থাকে।
তিনি বলেন, বর্তমান উপসাগরীয় সংঘাত স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে চরম অস্থিতিশীলতা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও ওমান বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য ও জ্বালানি ট্রানজিট রুট হিসেবে কাজ করতে পারে।
পরিসংখ্যান ও বাণিজ্যের বাস্তব চিত্র
চলমান যুদ্ধের প্রভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক দেশগুলোর সাথে ভারতের সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ভারতের আমদানি যেখানে ছিল ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তা ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়ায় মাত্র ৯.৮ বিলিয়ন ডলারে। একইভাবে ওই অঞ্চলে ভারতের রপ্তানিও ৪.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে হ্রাস পেয়ে মাত্র ২.৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
তবে এই মন্দার বাজারে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ওমান। হরমুজ সংকটের মধ্যেও ওমান থেকে ভারতের আমদানি ২৪৬.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর যেখানে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৩০ মিলিয়ন ডলার, তা এবার একলাফে বেড়ে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারে (১৫০ কোটি ডলার) উন্নীত হয়েছে।
মূলত ওমান থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং ইউরিয়া সার ক্রয়ের ফলেই এই বিশাল প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, ওমানে ভারতের সামগ্রিক রপ্তানি হ্রাসের হার ছিল অত্যন্ত নগণ্য- মাত্র ১০.৩ শতাংশ। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, হরমুজ প্রণালী ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে ওমান ভারতের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য এবং চমৎকার বিকল্প অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার।
চুক্তির ফলে ভারতের লাভ
সেপা চুক্তির আওতায় ওমানের মাস্কাট প্রশাসন ভারতের মোট রপ্তানি পণ্যের ৯৮.০৮ শতাংশ ট্যারিফ লাইনের ওপর শূন্য-শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে। এর ফলে ওমানে ভারতের মোট রপ্তানির ৯৯.৩৮ শতাংশ পণ্যই এখন কোনো শুল্ক ছাড়াই প্রবেশ করতে পারবে। এই চুক্তির আগে ভারতের মাত্র ১৫.৩ শতাংশ পণ্য ওমানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত।
ভারতের প্রধান শ্রমঘন শিল্পগুলো এই করমুক্ত সুবিধার ফলে সরাসরি লাভবান হবে। এর মধ্যে রয়েছে- রত্ন ও অলঙ্কার, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য, চামড়া, পাদুকা এবং ক্রীড়াসামগ্রী, প্লাস্টিক, আসবাবপত্র এবং প্রকৌশল পণ্য, ওষুধ চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং মোটরগাড়ি।
২০২৬ অর্থবৎসরে ওমানে ভারতের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শীর্ষস্থানে ছিল পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য, যেমন- পেট্রোল (৭৮১ মিলিয়ন ডলার) এবং ন্যাপথা (৭৪৬ মিলিয়ন ডলার)। এর পাশাপাশি ক্যালসাইন্ড অ্যালুমিনা (২৭৭ মিলিয়ন ডলার), লোহা ও ইস্পাত পণ্য (২৩০ মিলিয়ন ডলার), ভারী যন্ত্রপাতি (১৭৮ মিলিয়ন ডলার) এবং বাসমতি চাল (১৬৭ মিলিয়ন ডলার) উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রপ্তানি হয়েছে।
পূর্বে ভারতের ৮০ শতাংশের বেশি পণ্য ওমানে মাত্র ৫ শতাংশের মতো গড় শুল্কে প্রবেশ করলেও কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর ওমান ১০০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া শুল্ক আরোপ করে রেখেছিল। নতুন চুক্তিতে এই শুল্কের সম্পূর্ণ বিলোপ ঘটায় ওমানের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। তবে ওমানের জনসংখ্যা (৫৫ লাখ) এবং জিডিপির আকার (১১০ বিলিয়ন ডলার) তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় ভারতের রপ্তানি বৃদ্ধির গতি একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ওমানের প্রাপ্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিনিময়ে ওমানও ভারতের বিশাল বাজার থেকে ব্যাপক সুবিধা পাবে, বিশেষ করে যেসব খাতে ওমান ইতিমধ্যে ভারতকে পণ্য সরবরাহ করে আসছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত তার মোট ট্যারিফ লাইনের প্রায় ৭৮ শতাংশের ওপর থেকে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার বা হ্রাস করবে। এর ফলে ওমানের প্রধান রপ্তানি খাত- জ্বালানি, সার এবং শিল্প কাঁচামাল ভারতের বাজারে সস্তায় প্রবেশাধিকার পাবে।
২০২৬ অর্থবৎসরে ভারত ওমান থেকে প্রায় ৭.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। যার সিংহভাগ জুড়ে ছিল অপরিশোধিত তেল (১.৬ বিলিয়ন ডলার), তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (১.২ বিলিয়ন ডলার) এবং সার (৮৪৩ মিলিয়ন ডলার)। এছাড়াও ওমান ভারতের বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের একটি প্রধান উৎস, যেখান থেকে গত অর্থবৎসরে ৪৬৫ মিলিয়ন ডলারের মিথানল এবং ৪২৪ মিলিয়ন ডলারের অ্যামোনিয়া আমদানি করেছে ভারত।
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধ যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন ভারত ও ওমানের এই বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব কেবল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকেই চাঙা করবে না, বরং হরমুজ প্রণালীর ওপর ভারতের জ্বালানি নির্ভরতার ঝুঁকি কমিয়ে একটি নিরাপদ বিকল্প কৌশলগত পথ তৈরি করবে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন