মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের ঘনকালো মেঘ। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত এবার চূড়ান্ত রূপ নিতে চলেছে। টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানের অভ্যন্তরে একের পর এক ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর জবাবে কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা শক্তিশালী হামলা চালিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, প্রয়োজনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন।
এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এবারের হামলাগুলো মূলত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সামরিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যেই চালানো হয়েছে। মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ইরানের উপকূলীয় নিরাপত্তা ঘাঁটি, বিমান হামলা প্রতিরোধক আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টার এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টির কাজে ব্যবহৃত সামরিক স্থাপনাগুলোকে নিখুঁত নিশানা করে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানের স্থানীয় একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন হামলায় ইরানের আবু মুসা, কেশম ও কিশ দ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বন্দরনগরী বান্দার আব্বাসে একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে। এছাড়া দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কোনারাক, চাবাহার, বুশেহর এবং খুজেস্তান প্রদেশের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ভোর রাত ৩টা ১০ মিনিটে বুশেহর শহরে তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। অন্যদিকে খুজেস্তানের ওমিদিয়েহ শহরে মার্কিন হামলায় অন্তত চারজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ধ্বংসাত্মক হামলার পর বসে থাকেনি তেহরানও। ইরানের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালির আকাশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক ‘এমকিউ-১’ ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
একই সঙ্গে প্রথমে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং পরবর্তীতে কুয়েতে থাকা একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তারা। ইরানি বাহিনীর দাবি, এই হামলায় মার্কিন ঘাঁটির যোগাযোগ কেন্দ্র, জ্বালানি ডিপো এবং প্রতিরক্ষামূলক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যম ‘নিউজমেক্স’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সামরিক মেরুদণ্ড প্রায় ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইরানের ১৫৯টি যুদ্ধজাহাজ ও ২০০টি যুদ্ধবিমান আমরা ধ্বংস করে সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দিয়েছি। তাদের রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র তৈরি ব্যবস্থার ৮৪ শতাংশই এখন নিশ্চিহ্ন।’ ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘আমরা অনেকটাই তাদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছি। তারা মধ্যপ্রাচ্যে দাদাগিরি করত, কিন্তু আমার সঙ্গে সেটি করতে পারবে না।’
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গতকাল সোমবার রাতে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তাদের দুটি তেলবাহী ট্যাংকার মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিশ্চিত করেছে, ইরানের এলিট ফোর্স আইআরজিসি এই দুটি সুপারট্যাংকারে সফল হামলা চালিয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আজ মঙ্গলবার থেকে হরমুজ প্রণালির অভিভাবকত্ব গ্রহণ করছে। এই নৌপথের নিরাপত্তা খরচ জোগাতে এখান দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ বিশেষ ট্যাক্স বা চার্জ আরোপ করা হবে। একই সঙ্গে ইরানের নিজস্ব কোনো জাহাজ এই রুট ব্যবহার করতে পারবে না বলেও কড়া নিষেধাজ্ঞা দেন তিনি।
ট্রাম্পের এই ২০ শতাংশ শুল্ক দাবির জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটাক্ষ করে লিখেছেন, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার বিনিময়ে পারিশ্রমিক পাওয়া উচিত-মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই কথাটি ঠিক। ইরান সব সময়ই হরমুজের আসল অভিভাবক ছিল এবং থাকবে। তবে ট্রাম্পের দাবি করা ২০ শতাংশ শুল্ক একটু বেশিই, আমরা দায়িত্ব নিলে এর চেয়ে অনেক ন্যায্য ও কম চার্জ রাখব।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন