বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক পাড়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাজধানী গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের পদচারণায় মুখর ছিল। ভারত, তুরস্ক, মিশর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পৃথক পৃথক বৈঠকে মিলিত হন তারেক রহমান। এসব বৈঠকে আগামীর বাংলাদেশ পুনর্গঠন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সবার নজর ছিল ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকের দিকে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই বৈঠকে দুই দেশের অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, এটি আমরা অস্বীকার করছি না। তবে সেই চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে এই অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে হাইকমিশনারের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পাঠানো শোকবার্তায় বাংলাদেশের সঙ্গে যে নতুন সম্পর্ক তৈরির বার্তা দেওয়া হয়েছিল, আজকের আলোচনা তারই প্রতিফলন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের সঙ্গে প্রণয় ভার্মার এই সাক্ষাৎ দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বরফ গলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিএনপি ও ভারত একে অপরের সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে।
ভারতের পাশাপাশি তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মুস্তাফা ওসমান এবং মিশরের রাষ্ট্রদূত ওমর মহি এলদিন আহমেদ ফাহমী বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকগুলোতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য উন্নয়ন এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
হুমায়ুন কবির জানান, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। যদি বিএনপি আগামীতে সরকার গঠন করে, তবে পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করা হবে, তার একটি স্পষ্ট ধারণা রাষ্ট্রদূতদের দেওয়া হয়েছে।
কূটনীতিকদের পাশাপাশি এদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলও তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে। আসন্ন নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কথা এই বৈঠকে উঠে আসে। বিএনপি চেয়ারম্যান তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, তার দল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় প্রতিফলনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কূটনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেও দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখছেন তারেক রহমান। এদিন বিকেলে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ নেতারা বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করতে আসেন। জমিয়তের সভাপতি শাইখুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল তারেক রহমানের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সহ সভাপতি মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব এবং মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী। বৈঠকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আলেম ওলামাদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়। তারেক রহমান মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার আহ্বান জানান।
এদিনের বৈঠকগুলোর মাঝে একটি ভিন্নধর্মী খবর ছিল তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নির্দেশনা। তিনি তাকে মাননীয় বা কোনো বিশেষ বিশেষণে সম্বোধন না করার জন্য দলীয় নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুরোধ করেছেন।
তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের একজন সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই এ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ সম্বোধন এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। জানা গেছে, তারেক রহমান খুব শীঘ্রই সিলেটে হজরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন। কূটনৈতিক মহলের এই সরব উপস্থিতি এবং দলের অভ্যন্তরে নতুন প্রাণের স্পন্দন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত ঘটনাবহুল হতে চলেছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন