ইসি ঘেরাওয়ে দ্বিতীয় দিনেও অনড় ছাত্রদল: পোস্টাল ব্যালট ও শাবিপ্রবি ইস্যুতে উত্তাল আগারগাঁও

বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০২:০৮ পিএম
ইসি ঘেরাওয়ে দ্বিতীয় দিনেও অনড় ছাত্রদল: পোস্টাল ব্যালট ও শাবিপ্রবি ইস্যুতে উত্তাল আগারগাঁও

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। 

সোমবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে কয়েক হাজার নেতা-কর্মী ইসির প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

গতকাল রোববার টানা ৯ ঘণ্টা অবস্থানের পর আজ পুনরায় শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসিরের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন ইউনিটের নেতা-কর্মীরা অংশ নিয়েছেন।

ছাত্রদলের এই ঘেরাও কর্মসূচির পেছনে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি ও অভিযোগ রয়েছে, যা তারা ইসিকে লিখিতভাবে জানিয়েছে:

১. পোস্টাল ব্যালটে ‘ডিজাইন কারসাজি’র অভিযোগ: ছাত্রদলের দাবি, পোস্টাল ব্যালট পেপারের লেআউটে বড় ধরনের বৈষম্য করা হয়েছে। ৫টি কলাম এবং ১৪টি লাইনের এই ব্যালটে বিশেষ একটি গোষ্ঠীর প্রতীকগুলোকে উপরের সারিতে রাখা হলেও বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’কে একেবারে নিচের দিকে কৌশলে স্থাপন করা হয়েছে। এটি ভোটারদের বিভ্রান্ত করার একটি অপচেষ্টা বলে মনে করে সংগঠনটি।

২. শাবিপ্রবি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ‘বিতর্কিত’ প্রজ্ঞাপন: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ছাত্র সংসদ (সাসু) নির্বাচন স্থগিত করা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের জারি করা প্রজ্ঞাপনকে ‘গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য অশনিসংকেত’ হিসেবে অভিহিত করেছে ছাত্রদল। তাদের অভিযোগ, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষার্থেই ইসি এই নজিরবিহীন ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

৩. রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার: সংগঠনটির নেতাদের দাবি, ইসি বর্তমানে একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ইশারায় হঠকারী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। এর ফলে কমিশনের স্বাধীনতা ও পেশাদারত্ব আজ চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

আজ সরেজমিনে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনের প্রধান ফটকের সামনে পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কয়েক স্তরের কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছেন। ব্যারিকেডের ঠিক সামনেই অবস্থান নিয়েছেন কয়েক হাজার ছাত্রদল কর্মী। তারা ভোট চুরির নকশা মানি না' পক্ষপাতদুষ্ট ইসি নিপাত যাক—এমন সব স্লোগানে এলাকা মুখরিত করে রেখেছেন।

আন্দোলনরত এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, আমরা গতকাল ৯ ঘণ্টা অবস্থান করেছি। ইসি সচিব আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে তারা বিষয়টি দেখবেন। কিন্তু কার্যকর কোনো পরিবর্তন আমরা দেখিনি। যতক্ষণ পর্যন্ত এই ত্রুটিপূর্ণ পোস্টাল ব্যালট বাতিল করা না হবে এবং শাবিপ্রবি নির্বাচনের প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা না হবে, ততক্ষণ ঘেরাও কর্মসূচি চলবে।

রোববার বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া প্রথম দিনের কর্মসূচিতে বিকেল ৫টার দিকে ছাত্রদলের ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তারা জানিয়েছিলেন, কমিশন তাদের বক্তব্য শুনেছে এবং ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। তবে সেই আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে না পেরে রাতে কর্মসূচি স্থগিত করলেও আজ পুনরায় ঘেরাওয়ের ডাক দেয় সংগঠনটি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইসি ভবনের আশেপাশে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‍্যাব মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। ডিএমপি’র একজন কর্মকর্তা জানান, শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নেওয়া পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই, তবে জননিরাপত্তা বা সরকারি কাজে বাধা দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রদলের এই আন্দোলনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন স্থগিত করা এবং প্রথমবার প্রবর্তিত পোস্টাল ব্যালট নিয়ে এই বিতর্ক সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও সংশয় তৈরি করতে পারে।

ভোটের মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকতে মাঠপর্যায়ের এই অস্থিরতা নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। ছাত্রদলের দাবি অনুযায়ী ইসি কি তাদের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনবে নাকি অনড় অবস্থানে থাকবে—তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর নির্বাচনী পরিবেশ। আজ সন্ধ্যায় ছাত্রদল পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এএন