আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক ময়দানে নানামুখী মেরুকরণ দেখা গেলেও জনমনে বড় কৌতূহল ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ নিয়ে। তবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা আর আশ্বাসের ভিড়েও পুরোপুরি মিটেনি আসন ভাগাভাগির জট। জোটভুক্ত হলেও অন্তত ৬৫টি আসনে শরীক দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে।
নির্বাচনী ডামাডোল শুরুর পর বিএনপির বাইরে থাকা শক্তিশালী একটি বলয় তৈরির লক্ষ্যে গঠিত হয়েছিল এই ঐক্য। শুরুতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই জোটে থাকলেও আসন সমঝোতা নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় তারা এককভাবে ২৫৯টি আসনে প্রার্থী দিয়ে মাঠ গরম রেখেছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ লেবার পার্টি যুক্ত হওয়ার ফলে সংখ্যাগতভাবে '১১-দলীয় ঐক্য' নাম বজায় থাকলেও ভেতরের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে এই জোটে রয়েছে:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
খেলাফত মজলিস
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)
আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন
বাংলাদেশ লেবার পার্টি
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, এই জোটের মধ্যে সবচেয়ে বড় শক্তির জানান দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। তাদের প্রার্থীর সংখ্যা ২২৪ জন। অন্যান্য শরীকদের মধ্যে:
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস: ৩৩টি আসন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও এবি পার্টি: উভয় দলই ৩০টি করে আসনে লড়ছে।
খেলাফত মজলিস: ২০টি আসন।
এলডিপি: ১২টি আসন।
খেলাফত আন্দোলন: ৮টি আসন।
এছাড়া নেজামে ইসলাম ও বিডিপি ২টি করে এবং জাগপা ১টি আসনে নিজেদের শক্তিমত্তা যাচাই করবে।
জোটের মূল লক্ষ্য ছিল ২৯৯টি আসনেই একক প্রার্থী দিয়ে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ২৩২টি আসনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও ৬৫টি আসনে জোটের একাধিক প্রার্থী রয়ে গেছেন।
৫৯টি আসনে মুখোমুখি লড়াই হবে দুইজন করে প্রার্থীর। ৪টি আসনে রয়েছে ৩ জন করে প্রার্থী। ১টি আসনে জোটের ৪ জন প্রার্থী একে অপরের ভোট কাটাকাটিতে লিপ্ত হবেন।
বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এবি পার্টির মধ্যে অন্তত ১৮টি আসনে দ্বিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে জোটের কেন্দ্রীয় সংহতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সৌজন্যের উদাহরণও দেখা গেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট ত্যাগ করলেও বরিশাল-৫ আসনে দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের প্রতি সম্মান জানিয়ে ওই আসন থেকে নিজেদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিয়েছে ১১-দলীয় ঐক্য।
অন্যদিকে, পাবনা-১ ও ২ আসনে পুনঃ তফসিল হওয়ার কারণে সেখানে এখনো চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা নিয়ে ধূম্রজাল কাটেনি। সোমবার ছিল সেখানে প্রত্যাহারের শেষ দিন, ফলে এই দুই আসনের হিসাব জোটের সার্বিক পরিসংখ্যানে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৬৫টি আসনে একাধিক প্রার্থী থাকা মানে হলো জোটের ভোট ব্যাংক ভাগ হয়ে যাওয়া। যেখানে মূল প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির বলয়কে মোকাবিলা করার কথা, সেখানে নিজেদের প্রার্থীরাই যদি একে অপরের বিরুদ্ধে কুৎসা বা প্রচারে লিপ্ত হয়, তবে তার সুবিধা পাবে তৃতীয় পক্ষ। তৃণমূলের কর্মীরাও এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। কোন দলের প্রতীকে তারা ভোট দেবেন বা কার হয়ে কাজ করবেন, তা নিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে।
১১-দলীয় ঐক্য কি শেষ পর্যন্ত এই ৬৫টি আসনে কোনো 'অঘোষিত' সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে? নাকি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই ঘরোয়া লড়াই জোটের অস্তিত্বকেই সংকটে ফেলবে—তা দেখার জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে আপাতত, রাজধানীর কাকরাইলে ১৬ জানুয়ারির সেই এক মঞ্চের ছবি আর মাঠের লড়াইয়ের সমীকরণ যেন দুই মেরুতে অবস্থান করছে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন