ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বদলে যাওয়া ডেঙ্গুর রূপরেখা, মৌসুমি সংকটের গণ্ডি পেরিয়ে এখন স্থায়ী জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ

বিশেষ প্রতিবেদক

বিশেষ প্রতিবেদক

মার্চ ৩০, ২০২৬, ০৫:০২ পিএম

বদলে যাওয়া ডেঙ্গুর রূপরেখা, মৌসুমি সংকটের গণ্ডি পেরিয়ে এখন স্থায়ী জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ
মশার লার্ভা ধ্বংস করতে স্প্রে করা হচ্ছে। পূর্ব গির্জাপাড়া, মৌলভীবাজার।

বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা দেখে আসে না। একসময় জুলাই থেকে অক্টোবর অর্থাৎ বর্ষাকালীন আপদ হিসেবে পরিচিত এই রোগটি এখন বছরজুড়েই তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মশার বদলে যাওয়া আচরণের কারণে ডেঙ্গুর চিরচেনা মৌসুমি ধারা ওলটপালট হয়ে গেছে। 

ফলে ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে ডেঙ্গু মোকাবিলাকে আর সাময়িক কোনো তৎপরতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং একে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুহার পর্যালোচনা করলে এক আতঙ্কজনক চিত্র ফুটে ওঠে।

২০২৩ সাল ছিল দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত হন এবং প্রাণ হারান ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায় এবং মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালে ১ লাখ ২ হাজার ৫৬২ জন আক্রান্তের পাশাপাশি ৪১২ জন মৃত্যুবরণ করেন। ২০২৬ সালের শুরুতে যদিও সংক্রমণ কিছুটা কম, তবে প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রমাণ করে যে ভাইরাসটি পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।

এডিস এজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিক্টাস প্রজাতির মশা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অভিযোজিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্বাভাবিক আবহাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণতার কারণে মশার প্রজনন চক্রে পরিবর্তন এসেছে। দ্রুত নগরায়ণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে এডিস মশা এখন শুধু বর্ষার বৃষ্টির পানিতে নয়, বরং শীত বা গরমেও মানুষের তৈরি কৃত্রিম জলাধারে বংশবিস্তার করছে। ফলে ডেঙ্গু এখন আর কোনো একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে সীমাবদ্ধ নেই।

ডেঙ্গু একসময় কেবল রাজধানী কেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন তা দেশের সবকটি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে মানিকগঞ্জ, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলাতেও সংক্রমণের উচ্চ হার দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বরিশাল বিভাগ অনেক সময়ই আক্রান্তের তালিকায় শীর্ষস্থানে উঠে আসছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ভেক্টরের বিস্তার এখন দেশব্যাপী।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে নারীদের মৃত্যুহার অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় বেশি। এ ছাড়া ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তি এবং যারা আগে একবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন (সেরোটাইপ পরিবর্তন), তাদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে 'ডেঙ্গু শক সিনড্রোম' এবং দীর্ঘস্থায়ী কো-মরবিডিটিস (যেমন ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ) আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে পড়ে। মূলত সঠিক সময়ে হাসপাতালে না আসা এবং চিকিৎসার বিলম্বই মৃত্যুহার বাড়ানোর প্রধান কারণ।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রধানত তিনটি বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। 

১. হাসপাতালের ওপর চাপ: প্রাদুর্ভাবের সময় শয্যা ও আইসিইউ সংকট প্রকট হয়ে ওঠে।

২. সমন্বয়ের অভাব: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেও মশা মারার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগের। এই দুই বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে অনেক সময় মশক নিধন কার্যক্রম লোক দেখানো বা অনিয়মিত হয়ে পড়ে।

৩. কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা: প্রথাগত ফগিং বা স্প্রে এখন আর মশা মারতে পারছে না। এডিস মশা প্রচলিত কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী শহরগুলোতে ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশন এবং সাধারণ জনগণকে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সরাসরি যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। জমে থাকা পানি অপসারণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নই এখন প্রধান লক্ষ্য।

ড. এ এস এম আলমগীরের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি জাতীয় সমন্বয় কমিটি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং গবেষকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে হবে যারা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। কেবল বর্ষাকালে নয়, সারা বছর মশার লার্ভা পরীক্ষা ও উৎস ধ্বংসের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। প্রতিটি সিটি করপোরেশনে পর্যাপ্ত সংখ্যক এন্টোমোলজিস্ট বা কীটতত্ত্ববিদ নিয়োগ দেওয়া। 'ওলবাকিয়া' পদ্ধতির মতো মশা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি বা সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের গবেষণা জোরদার করা।

প্রতিটি বাড়িতে নাগরিকরা যাতে নিজ উদ্যোগে সপ্তাহে অন্তত একদিন জমা পানি পরিষ্কার করেন, সেই সচেতনতা তৈরি করা।

ডেঙ্গু এখন কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি একটি নাগরিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বদলে যাওয়া এই মরণঘাতী ভাইরাসের লাগাম টেনে ধরতে। শহর পরিষ্কার রাখা আর মশার বংশবিস্তার রোধে প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতাই হবে এই লড়াইয়ের মূল হাতিয়ার।

তথ্য ও বিশ্লেষণ: ড. এ এস এম আলমগীর, ভাইরোলজিস্ট ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর।

এএন

Link copied!