নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ৯, ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সংস্কারের জোরালো দাবি আর সংসদীয় বিতর্কের গণ্ডি পেরিয়ে এবার রাজপথের উত্তাপ ছড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী শক্তি। জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণভোটের নিরঙ্কুশ রায় বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কার ও বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য।
সংসদের ভেতরে মুলতবি প্রস্তাব, ওয়াকআউট এবং কঠোর সমালোচনার পর এখন দেশব্যাপী গণসংযোগ ও বিক্ষোভের মাধ্যমে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করাই জোটটির মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর এটিই হতে যাচ্ছে দেশীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় রাজপথের চ্যালেঞ্জ।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় রচিত হয়েছিল। একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করলেও, গণভোটে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ জয়ধ্বনি দেয়।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, জনগণের এই বিপুল জনরায়ের পরও সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বরং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে তৈরি হয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক জট। এই অচলাবস্থা কাটাতেই রাজপথে নামার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১১-দলীয় জোট।
১১-দলীয় লিয়াজোঁ কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে আন্দোলনের যে নকশা তৈরি করা হয়েছে, তাতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে জনমত গঠনকে। জোটের শীর্ষ নেতাদের মতে, এই আন্দোলন কোনো অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য নয়, বরং জনগণের সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের জন্য।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ধারাবাহিক বিক্ষোভ মিছিল এবং সমাবেশের আয়োজন। জুলাই সনদের গুরুত্ব এবং সরকারের ‘গড়িমসি’ সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে দেশব্যাপী লিফলেট বিতরণ।
সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা। তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি মতবিনিময় এবং জনসংযোগ।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ স্পষ্ট করেছেন যে, বিরোধী দলের এই আন্দোলন হবে সম্পূর্ণ অহিংস। তিনি জানান, ৪ এপ্রিলের বায়তুল মোকাররমের সমাবেশের মাধ্যমেই এই যাত্রার সূচনা হয়েছে এবং সংস্কার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত এটি চলবে।
সংসদে জামায়াত ও তার মিত্ররা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে একাধিকবার সোচ্চার হয়েছে। গত ২৯ মার্চ এবং ৩০ মার্চ পৃথক দুটি মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করা হলেও স্পিকারের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। উল্টো সরকারের পক্ষ থেকে বিকল্প প্রস্তাব আনার চেষ্টাকে ‘সংস্কার ধামাচাপা’ দেওয়ার অপকৌশল হিসেবে দেখছে ১১ দল।
তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধী দলগুলো ১ এপ্রিল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। তাদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা কমিয়ে সরকার মূলত জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে অবজ্ঞা করছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নই এখন আমাদের মূল দাবি। সরকার জন-আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়ন করছে, তা আমরা জনগণের সামনে খোলাসা করতে চাই। প্রয়োজনে আমাদের নির্বাচনী ঐক্য একটি স্থায়ী রাজনৈতিক জোটেও রূপান্তরিত হতে পারে।
১১-দলীয় জোটের মূল কর্মসূচির পাশাপাশি শরিক দলগুলো এবং ছাত্রসংগঠনগুলোও আলাদাভাবে মাঠে নেমেছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ইতোমধ্যেই জাতীয় প্রেসক্লাবে সেমিনার এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে।
শিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম জানিয়েছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে তাঁদের ছাত্র আন্দোলনের ধারা অব্যাহত থাকবে।
জোটের বাইরে থেকে তারা আগামীকাল ১০ এপ্রিল দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং ২৪ এপ্রিল ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল গণসমাবেশের ডাক দিয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। ১৭ ফেব্রুয়ারির শপথ অনুষ্ঠানে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা দুটি শপথ নিলেও ক্ষমতাসীন বিএনপির সদস্যরা দ্বিতীয় শপথটি গ্রহণ করেননি।
এই দ্বৈত শপথের জটিলতায় আজও সংবিধান সংস্কার পরিষদ আলোর মুখ দেখেনি। ফলে জুলাই সনদে থাকা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র সংস্কারের কাজগুলো আটকে আছে। বিরোধী দল মনে করছে, সংসদ থেকে জনগণের কাছে ফিরে যাওয়া ছাড়া এই দাবি আদায়ের আর কোনো বিকল্প নেই।
আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে বিএনপির বাইরে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে ১১ দল। জোটের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ইঙ্গিত দিয়েছেন, এটি কেবল জামায়াত বা ১১ দলের লড়াই নয়, এটি জুলাই বিপ্লবে অংশ নেওয়া প্রতিটি নাগরিকের লড়াই।
৭ এপ্রিল থেকে ঘোষিত সাত দিনের কর্মসূচি দেশজুড়ে বিরোধী শক্তির অবস্থানকে জানান দিচ্ছে। একদিকে সরকার যখন রাষ্ট্রীয় পরিচালনা নিয়ে ব্যস্ত, অন্যদিকে বিরোধী দল তখন ‘জনরায়’ বাস্তবায়নের দাবিতে জনমত গড়ছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের লড়াই এখন রাজপথে ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে প্রবল আগ্রহ।
ইসলামাবাদে যেমন আন্তর্জাতিক কূটনীতি চলছে, তেমনি বাংলাদেশের অলিগলিতে এখন আলোচনার তুঙ্গে জুলাই সনদ কি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে? নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক সংঘাতের নতুন এক উপাদানে পরিণত হবে?
উত্তর পেতে হয়তো আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে, তবে ১১-দলীয় জোটের অবস্থান পরিষ্কার রাজপথই এখন তাঁদের চূড়ান্ত গন্তব্য।
এএন