ক্রীড়া প্রতিবেদক
জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম
ক্রিকেটকে বলা হয় ভদ্রলোকের খেলা, যেখানে ব্যাটে বলের লড়াই ছাপিয়ে মানবিক সৌজন্যবোধই ছিল পরম আরাধ্য। কিন্তু ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ যত ঘনিয়ে আসছে, ক্রিকেটের সেই চিরচেনা রূপ ততই ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
মাঠের বাউন্ডারি এখন আর কেবল সাদা দড়িতে সীমাবদ্ধ নেই, সেখানে ঢুকে পড়েছে ভূ রাজনৈতিক কাঁটাতার। মাঠের ক্রিকেটের চেয়েও এখন বড় হয়ে উঠেছে কূটনৈতিক দড়িটানাটানি। বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি ক্রিকেট বিশ্বের সামনে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে।
নিজেদের পায়েই কি কুড়াল মারছে ভারত? বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের আগে সাধারণত আলোচনা হওয়ার কথা ফেবারিট দল, পিচ কন্ডিশন কিংবা সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আলোচনার কেন্দ্রে এখন একটাই প্রশ্ন, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক আবহাওয়া কি ক্রিকেটের শ্বাসরোধ করছে? ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে ভারত ক্রিকেটীয় আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে এমন এক অহমিকা প্রদর্শন করছে, যার শিকার কেবল প্রতিপক্ষ দেশগুলোই নয়, খোদ ক্রিকেট খেলাটাই। আইসিসি বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে জয় শাহের অভিষেক এবং ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুত্র হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে বিসিসিআই বা ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড এবং আইসিসি কি এখন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ?
এবারের বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমান। আইপিএল বা ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে বছরের পর বছর দাপটের সঙ্গে খেলা এই ক্রিকেটারকে হঠাৎ করেই নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো অপরাধ বা শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে নয়, বরং অভিযোগ উঠেছে ভারতে ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক মতবাদের বলি হয়েছেন তিনি।
বিসিসিআই এর এই সিদ্ধান্ত একটি গভীর স্ববিরোধিতার জন্ম দিয়েছে। যে মোস্তাফিজকে হাজারো নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকা আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ বলে গণ্য করছে, সেই একই দেশে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের পুরো স্কোয়াড, কোচিং স্টাফ এবং হাজার হাজার সমর্থক কীভাবে নিরাপদ বোধ করবেন? একজন একক মুসলিম তারকা ক্রিকেটার যদি রাজনৈতিক বিষবাষ্প থেকে রেহাই না পান, তবে পুরো একটি দেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

বিসিবির শঙ্কা ও বিশ্বকাপের অনিশ্চয়তা ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি ক্রিকেটীয় অবকাঠামোর চেয়েও রাজনৈতিক আদর্শকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে যেখানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ, সেখানে একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়, সাংবাদিক ও সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের এই অবস্থান পরোক্ষভাবে সেই আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করছে যা আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিল।
অর্থাৎ ভারতের মাটিতে বিদেশি ক্রিকেটারদের, বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় মুসলিম ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা এখন আর কেবল ক্রিকেটীয় বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
ক্রিকেট রোমান্টিকেরা যখন মাঠের লড়াই দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন, তখন পর্দার আড়ালের এই নোংরা রাজনীতি খেলার মূল স্পিরিটকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো আসর যদি কূটনৈতিক বিরোধের মঞ্চে পরিণত হয় তবে তা বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য এক অশনিসংকেত। ভারত যদি তাদের অকারণ অহমিকা এবং রাজনীতিকীকরণের পথ থেকে সরে না আসে তবে কেবল বাংলাদেশ নয়, অনেক দেশের জন্যই সেখানে খেলতে যাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে।
ক্রিকেট কি শেষ পর্যন্ত কাঁটাতারের বেড়াজালে আটকে মরবে নাকি ব্যাটে বলের সেই শুদ্ধ লড়াইয়ে ফিরবে, সেই উত্তর সময়ের হাতেই তোলা রইল। তবে মোস্তাফিজ ইস্যু যে বিশ্বকাপের ড্রেসিংরুমে আশঙ্কার কালো মেঘ জমিয়ে দিয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
জেএইচআর