আমার সংবাদ ডেস্ক
সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৫, ১১:৫৮ এএম
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, লালনগীতির সম্রাজ্ঞী এবং কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান ফরিদা পারভীন আর নেই।
শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।
দীর্ঘ ১৪ দিন ধরে তিনি হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন। মৃত্যুর সময় তার পাশে ছিলেন স্বামী, প্রখ্যাত বংশীবাদক আব্দুল হাকিম এবং দুই সন্তান এমআই নাহিল ও জেহান ফারিয়া। শিল্পীর মৃত্যুসংবাদে দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় তার গাওয়া গানের স্মৃতিচারণায়।
দাফন কুষ্টিয়ায়
ফরিদা পারভীনের স্বামী আব্দুল হাকিম চেয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করতে। তবে শিল্পীর দুই ছেলে এবং পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিল্পীর নিজস্ব অসিয়তকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
রোববার এশার নামাজের পর কুষ্টিয়ার পারিবারিক কবরস্থানে বাবা দেলোয়ার হোসাইন ও মা রওফা বেগমের সমাধিস্থলে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে ফরিদা পারভীনের দাফন সম্পন্ন হয়। স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তার জানাজায় অংশ নেন। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জানাজায় উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
শৈশব ও ব্যক্তিগত জীবন
কুষ্টিয়ার মাটিতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফরিদা পারভীনের শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। স্থানীয় সংগীত শিক্ষকদের কাছে গান শেখা শুরু করেন তিনি। ছোটবেলায়ই তার কণ্ঠের স্বরলিপি চারপাশের মানুষকে মুগ্ধ করত।
ব্যক্তিগত জীবনে ফরিদা পারভীন প্রথমে জনপ্রিয় গীতিকার ও সুরকার আবু জাফরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ দম্পতির এক মেয়ে ও তিন ছেলে ছিল। পরবর্তীতে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পরে ২০০৫ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি বিশিষ্ট বংশীবাদক আব্দুল হাকিমকে বিয়ে করেন। এ সংসারে তাদের কোনো সন্তান ছিল না, তবে তারা একসাথে ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
শিল্পজীবনের উত্থান
ফরিদা পারভীনের গানজীবন শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে। প্রথমদিকে তিনি নজরুলগীতি ও আধুনিক গান পরিবেশন করলেও পরবর্তীতে লালনগীতির প্রতি গভীর ঝোঁক জন্মায়। ধীরে ধীরে লালনগীতির অনন্য পরিবেশক হিসেবে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। তার কণ্ঠে লালনের গান যেন নতুন প্রাণ পেয়েছিল। এজন্যই তাকে বলা হয় “লালনগীতির সম্রাজ্ঞী”।
জনপ্রিয় গান
তার গাওয়া জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে—
“এই পদ্মা এই মেঘনা”
“তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম”
“নিন্দার কাটা”
এছাড়া শত শত লালনগীতি ও নজরুলগীতি রয়েছে যা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার পরিবেশনা ছিল গভীর আবেগময় এবং দর্শনসমৃদ্ধ, যা শ্রোতাদের হৃদয়ে নাড়া দিত।
পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
ফরিদা পারভীন তার অসামান্য অবদানের জন্য বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— একুশে পদক (১৯৮৭) লালনগীতি চর্চায় অনন্য অবদানের জন্য। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার– সেরা নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে একাধিকবার।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে সম্মাননা – ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বহু দেশে লালনগীতি পরিবেশন করে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পরিচিত করেছেন।
প্রভাব ও উত্তরাধিকার
ফরিদা পারভীন শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ। লালনের মানবতাবাদ, প্রেম, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের দর্শন তিনি গান দিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন দেশের প্রতিটি প্রান্তে। তার গান নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং সংগীতশিল্পীদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন এক প্রেরণার প্রতীক।
দেশজুড়ে শোক
তার মৃত্যুর পর থেকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। শিল্পকলা একাডেমি, ছায়ানটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন শোকবার্তা জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ লিখেছেন, ফরিদা পারভীন ছিলেন আমাদের হৃদয়ের শিল্পী। তার কণ্ঠে আমরা লালনকে চিনেছি। তিনি না থাকলেও তার গান চিরকাল বেঁচে থাকবে।
ফরিদা পারভীনের প্রয়াণে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হলো। তার কণ্ঠ, তার পরিবেশনা এবং তার জীবনভর অবদান আমাদের সংস্কৃতির ভাণ্ডারে এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।
আমরা সবাই তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি এবং আশা করি, নতুন প্রজন্ম তার গাওয়া গান থেকে মানবতা, প্রেম ও ভ্রাতৃত্বের পাঠ শিখতে থাকবে।
জেএইচআর