আমার সংবাদ ডেস্ক
জানুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১২:২১ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন চরম সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ময়মনসিংহ ১ (হালুয়াঘাট থেকে ধোবাউড়া) আসনে বিএনপির দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধে প্রাণ হারিয়েছেন নজরুল ইসলাম (৪০) নামের এক সক্রিয় কর্মী।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ধোবাউড়ার ঘোষগাঁও ইউনিয়নে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় আজ শনিবার ভোরে নিহতের পরিবার থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
আনন্দ মিছিল থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ ১ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সালমান ওমর। দীর্ঘদিন ধরে এই দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনা চলে আসছিল।
শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ধোবাউড়া উপজেলার ঘোষগাঁও ইউনিয়নের এরশাদ বাজার এলাকায় সালমান ওমরের একটি নতুন নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, কার্যালয় উদ্বোধনের আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যেই হঠাৎ করে একদল সশস্ত্র লোক সেখানে হামলা চালায়।
অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রার্থীর সমর্থক আজহারুল ইসলাম ও মো. রোমানের নেতৃত্বে এই হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্র ও ছুরি নিয়ে কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়। এ সময় কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সালমান ওমরের একনিষ্ঠ সমর্থক নজরুল ইসলামকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
থানায় অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপ হত্যাকাণ্ডের পর শনিবার ভোরে নিহতের ছেলে মো. সোলাইমান বাদী হয়ে ধোবাউড়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। মামলায় ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০ থেকে ২২ জনকে আসামি করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির প্রার্থীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত আজহারুল ইসলাম ও রোমানকে ঘটনার মূল উসকানিদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত আদম আলী (৫৪) ও দুলাল মিয়া (৫৩) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
ধোবাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নিহতের পরিবার তাদের অভিযোগে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও এই আসনের প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহর নাম উল্লেখ করেনি। আমরা মূল অপরাধীদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রেখেছি।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও পুরনো বিরোধ ময়মনসিংহ ১ আসনের এই সহিংসতা হঠাৎ করে ঘটা কোনো ঘটনা নয় বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা। এই সংসদীয় আসনে বিএনপির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৈয়দ এমরান সালেহ এবং সালমান ওমরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ বিদ্যমান।
সালমান ওমর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই বিভক্তি তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে চরম শত্রুতা তৈরি করেছে। নজরুল ইসলাম ছিলেন সালমান ওমরের নির্বাচনী প্রচারণার একজন সক্রিয় মুখ। নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের মতো একটি প্রকাশ্য কর্মসূচিতে এই হত্যাকাণ্ড প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার এবং ভয় দেখানোর একটি কৌশল বলে মনে করছেন সালমান ওমরের সমর্থকরা।
আতঙ্কে সাধারণ ভোটার হত্যাকাণ্ডের পর ধোবাউড়া উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের রামসিংহপুর গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত নজরুল ইসলামের বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্ত্রী ও সন্তানেরা।
এদিকে এই ঘটনার পর ধোবাউড়া ও হালুয়াঘাট উপজেলার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারকেন্দ্রগুলোতে উপস্থিতি কমে গেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভোটারদের আশঙ্কা, নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে এই ধরণের সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া না গেলেও স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় তারা কঠোর নীতি গ্রহণ করবে। ওসির ভাষ্যমতে, পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সব পক্ষকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। যেকোনো ধরণের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার চ্যালেঞ্জ যখন নির্বাচন কমিশনের সামনে, তখন ময়মনসিংহের এই হত্যাকাণ্ড পুরো নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। রাজনৈতিক আদর্শের লড়াই যখন প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ম্লান হয়ে যায়। নিহতের পরিবার এখন সঠিক বিচারের আশায় প্রহর গুনছে।
জেএইচআর