নিজস্ব প্রতিনিধি
ডিসেম্বর ১, ২০২৫, ১১:৩০ পিএম
দেশের স্বর্ণবাজারে চলতি বছরের শেষ প্রান্তে এসে আবার দেখা দিয়েছে তীব্র মূল্যবৃদ্ধি। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা ডিসেম্বরের প্রথম দিনেই আরও জোরালো হয়েছে।
টানা দুই দফা সমন্বয়ে ভরিপ্রতি প্রায় চার হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়ে নতুন দর মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হচ্ছে। সর্বশেষ এ সংশোধনে শুধু ২২ ক্যারেটেই বাড়ল ১ হাজার ৫৭৫ টাকা। এর ফলে ভরিভিত্তিক স্বর্ণ কেনাবেচায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে ক্রেতা ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের বাজারেও মূল্য তালিকা হালনাগাদ করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। সংগঠনের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থার চাপের সঙ্গেই এই সমন্বয় যুক্ত।
বাজুসের ঘোষণা অনুযায়ী ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরির দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ১৪৫ টাকা। ২১ ক্যারেট নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৪৯৯ টাকা দরে। ১৮ ক্যারেটের নতুন দাম ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭২ টাকা, এবং সনাতন পদ্ধতিতে প্রস্তুত স্বর্ণের ভরি এখন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪২৪ টাকা। বাজুস আরও জানিয়েছে, ঘোষিত মূল্যের সঙ্গে সর্বদা সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস-নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করতে হবে। গহনার ধরন ও কারুকাজ অনুযায়ী মজুরি বাড়তেও পারে।
এর ঠিক তিন দিন আগে ২৯ নভেম্বর স্বর্ণদাম সমন্বয় করেছিল বাজুস। তখনই ভরিপ্রতি ২ হাজার ৪০৩ টাকা বাড়ানো হয়। সে হিসেবে মাত্র দুই দফায় দাম বেড়েছে মোট ৩ হাজার ৯৭৮ টাকা। তখন ২২ ক্যারেটের ভরি-দর দাঁড়ায় ২ লাখ ১০ হাজার ৫৭০ টাকা। সেই দামের ওপরই সোমবার রাতের নতুন ঘোষণা যুক্ত হওয়ায় বাজারে স্বর্ণের দামে টেকসই ঊর্ধ্বচাপ তৈরি হয়েছে।
স্বর্ণবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মূল্য অস্বাভাবিক হারে লাফাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ-আমেরিকায় চাহিদা বেড়ে যাওয়া, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারের ওঠানামা স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ সংগ্রহে খরচ বেড়ে যাওয়াই দামের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন বাজুস সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৮২ বার স্বর্ণদাম সমন্বয় করা হয়েছে যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বছরের জন্য সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ৫৬ বার বেড়েছে এবং ২৬ বার কমেছে। গত বছর (২০২৪) মোট সমন্বয় হয়েছিল ৬২ বার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ২০ বার বেশি সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছে বাজার। এই পরিসংখ্যানই দেখায়, স্বর্ণের বাজার কতটা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
স্বর্ণের দামের এই ওঠানামার বিপরীতে রুপার বাজার তুলনামূলক শান্ত। ২২ ক্যারেট রুপার প্রতি ভরির দাম বর্তমানে ৪ হাজার ২৪৬ টাকা। ২১ ক্যারেট ৪ হাজার ৪৭ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৩ হাজার ৪৭৬ টাকা, এবং সনাতন পদ্ধতির ভরি ২ হাজার ৬০১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চলতি বছর মাত্র ৯ বার এই ধাতুর দাম সমন্বয় হয়েছে, এর মধ্যে ৬ বার বেড়েছে এবং ৩ বার কমেছে। গত বছর সমন্বয় ছিল মাত্র ৩ বার।
স্বর্ণের দাম বাড়ায় বিয়ের মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। যারা বাজেট ধরে গহনা কেনার পরিকল্পনা করেছেন, হঠাৎ দামের উল্লম্ফনে তারা কিনতে পারছেন না আগের পরিমাণ। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বাড়ায় বিক্রি কমে যাচ্ছে এবং অনেক দোকানেই অগ্রিম অর্ডারের চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে অনেক জুয়েলারি ব্যবসায়ী আবার সুযোগ দেখছেন। তারা বলছেন, দামের ঊর্ধ্বগতির সময়ে বিনিয়োগকারীরা হঠাৎ স্বর্ণ কেনায় আগ্রহী হন—দাম আরও বাড়বে এই প্রত্যাশায়। এতে বাজারে কিছুটা লেনদেন বাড়লেও সাধারণ ভোক্তাদের উপর চাপ আরও বাড়ে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এক বছরে ৮০ বারের বেশি মূল্য সমন্বয় বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এতে বিনিয়োগ, খুচরা বেচাকেনা এবং আমদানির ওপরও প্রভাব পড়ে। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে স্থানীয় বাজারের সংযোগ স্বাভাবিক হলেও এত দ্রুত দামের ওঠানামা বাজারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দাম উর্ধ্বমুখী থাকা অবস্থায় বাংলাদেশেও স্বর্ণের দামে আরও সমন্বয় আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আভাস দিয়েছেন বাজুস সংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ ডিসেম্বর মাসেও আরও বাড়তে পারে স্বর্ণের দাম, যদিও বর্তমানে রুপার বাজার স্থিতিশীল রয়েছে।
ইএইচ