বিশেষ প্রতিবেদক
মার্চ ২৮, ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক অভূতপূর্ব সংকটের ছায়া ফেলেছে। আমদানিনির্ভর এই খাতে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য বড় ধরনের ঘাটতি এড়াতে সরকার এখন মরিয়া হয়ে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছে ঋণের আবেদন জানাচ্ছে।
১৮ কোটি মানুষের এই দেশে বার্ষিক জ্বালানি আমদানি ব্যয় যেখানে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার, সেখানে চলমান সংকটের কারণে এই খরচ আরও ৪০ শতাংশ বা প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই বিশাল অংকের অর্থের জোগান দিতেই এখন বিদেশি মুদ্রার সন্ধানে নেমেছে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো।
গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস (জেডসিএ)-এর সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুযায়ী, মার্চ মাসে বাংলাদেশ ২ লাখ ৯৩ হাজার টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং সরবরাহ চেইনের বিঘ্নতার কারণে ইতিমধ্যে ৬০ হাজার টনের অর্ডার বাতিল করতে হয়েছে।
চলতি মাসে ১৮টি তেলের জাহাজ আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত ভিড়তে পেরেছে মাত্র ৯টি। অর্থাৎ, অর্ধেকের বেশি সরবরাহ এখনো অনিশ্চিত। এই ঘাটতি পূরণ এবং ভবিষ্যতের জন্য তেলের মজুত নিশ্চিত করতেই বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
সংকট মোকাবিলায় বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান সরকারকে ঋণের আশ্বাস দিয়েছে। ইতিমধ্যে ঋণ ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে:
আইএমএফ (IMF): আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রতিনিধি দলের সাথে ১৩০ কোটি ডলার ছাড়ের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
এডিবি (ADB): এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রাথমিকভাবে ৫০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা অনুমোদন করেছে, যা পরবর্তীতে ৭৫ থেকে ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে।
আইডিবি (IDB): ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ২১০ কোটি ডলারের বড় অংকের ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
আইএফসি (IFC): বিশ্বব্যাংকের এই সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে আরও ৫০ কোটি ডলার আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এই পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই আশ্বাস সরকারের প্রতি তাদের আস্থার প্রতিফলন। তিনি আশা করছেন, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সচল রেখে অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
তবে এই ঋণের মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন যে, ঋণের পরিমাণ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের আমদানি সক্ষমতা বা 'ইমপোর্ট কভার' যে পর্যায়ে আছে, তা ৫ মাসের নিচে নেমে আসতে পারে।
সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো মূল্যস্ফীতি। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পরিবহন ও উৎপাদন খাতে পড়বে, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যদি এই চাপ সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হয়, তবে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক হবে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আইনুল ইসলাম মনে করেন, এই আপদকালীন সংকটের বোঝা কোনোভাবেই সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপানো ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, "বিশ্বের অনেক দেশই এখন জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঋণের দিকে ঝুঁকছে। সরকারকে নজর দিতে হবে যেন স্বল্প সুদে এবং সহজ শর্তে এই ঋণ পাওয়া যায়। এই ঋণের দায় সরকারকে বহন করতে হবে, জনগণের ওপর তেলের দাম বাড়িয়ে চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।"
সরকার এখন দ্বিমুখী সংকটে রয়েছে একদিকে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের বোঝা সামলানো। জাহাজ আসার গতি কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের আকাশচুম্বী দাম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সামনের দিনগুলোতে যদি মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে বার্ষিক জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি ডলারের সংস্থান করা হবে সরকারের জন্য সবচাইতে বড় অগ্নিপরীক্ষা।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদেশি ঋণের বিকল্প এই মুহূর্তে সরকারের হাতে নেই বললেই চলে। তবে এই ঋণের অর্থ যেন সঠিকভাবে কেবল জ্বালানি আমদানিতেই ব্যবহৃত হয় এবং কোনো ধরনের অপচয় না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
আস্থার সংকট কাটিয়ে দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে দ্রুত অর্থছাড় নিশ্চিত করা গেলেই কেবল আসন্ন বড় ধরনের লোডশেডিং বা জ্বালানি বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
এএন